বৃহস্পতিবার, ২৯ জুলাই ২০২১, ০৮:৩১ পূর্বাহ্ন

অনলাইনে অপপ্রচার: পরিত্রাণের উপায়

ব্যারিষ্টার প্রজ্ঞা, ঢাকা জজ কোর্ট

অনলাইনে কেউ হত্যার হুমকি দিলে করণীয় কি? আইনগতভাবে এইধরনের অপরাধের শাস্তি কি? নির্যাতিত ব্যাক্তি কিভাবে এথেকে পরিত্রাণ পেতে পারে। এসব বিষয় বিস্তারিত জানতে লেখাটি পড়ুন।

বর্তমান যুগে আমাদের যোগাযোগ মাধ্যমের একটি আমূল পরিবর্তন হয়েছে। বাংলাদেশের সচেতন গোষ্ঠীর খুব বড় একটা অংশ ইন্টারনেট ব্যবহার করছে এবং মত প্রকাশে তারা পিছপা হচ্ছেন না, যেটি অবশ্যই প্রশংসার যোগ্য। ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব, ব্লগ ও অনলাইন পত্রিকাতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ইস্যুতে নানারকম আলোচনার পাশাপাশি সমালোচনায় মুখর নেটিজেন হিসেবে পরিচিত নতুন বাংলাদেশী প্রজন্ম। কিন্তু এই অবাধ ও ফ্রি ইন্টারনেটের সুবিধা নিয়ে দেখা যাচ্ছে কিছু মানুষ স্বেচ্ছাচারী ভাবে প্রবল বিষোদগারে এবং বর্বরোচিত উল্লাসে মেতে উঠেছে। এই কথা এজন্য বলা যে, বাংলাদেশের অন্যতম বিখ্যাত ইউটিউবার এবং অনলাইনে শিক্ষা দান কর্মসূচী বিষয়ক সংস্থা টেন মিনিট স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নিবার্হী আয়মান সাদিক কে হত্যার হুমকি দেয়া হয়েছে। একইসঙ্গে হত্যার হুমকি দেয়া হয়েছে টেন মিনিট স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা সাকিব বিন রশীদ কেও।

এক্ষেত্রে দেখা এরকম পরিস্থিতির শিকার হলে ভিকটিমের করণীয় সম্পর্কে দেশের আইন কি বলে। এখানে উল্লেখযোগ্য যে মত প্রকাশের স্বাধীনতার নামে এমন কিছু লেখা যাবে না বা স্ট্যাটাস দেওয়া যাবে না যা অন্যের অধিকার মর্যাদা শান্তি বিঘ্নিত করতে পারে।

আইনের ধারাঃ

কোন ব্যক্তি যদি ওয়েবসাইট বা ডিজিটাল মাধ্যমে ইচ্ছাকৃতভাবে বা জ্ঞাতসারে কাউকে আক্রমণাত্মক বা ভীতি প্রদর্শক অথবা মিথ্যা জানা সত্ত্বেও কোন মানুষকে বিরক্ত অপমান-অপদস্থ এবং হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য কোনো রকম তথ্য প্রকাশ বা প্রচার করেন, তাহলে উক্ত ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ভিকটিম বাংলাদেশের ‘তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন, ২০০৬ (সংশোধনী ২০১৩)-এর ২৫ ধারায়’ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবেন।

শাস্তিঃ

ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের ২৫ ধারায় বলা হয়েছে, কেউ যদি ওয়েবসাইট বা ডিজিটাল মাধ্যমে আক্রমণাত্মক ভয়ভীতি দেখান, তাহলে তাকে তিন বছরের জেল ও তিন লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড দেওয়া যাবে।

কোথায় অভিযোগ করবেনঃ

  • প্রাথমিকভাবে অভিযোগ করতে পারেন আপনার নিকটস্থ থানায়। অথবা,
  • ই-মেইলে অভিযোগ জানাতে পারেন cyberhelp@dmp.gov.bd এই ঠিকানায়। অথবা
  • সরাসরি কথা বলার প্রয়োজনবোধ করলে চলে যেতে পারেন ডিএমপি’র কাউন্টার টেরোরিজম ডিভিশনের Cyber Crime Unit অফিসে। কথা বলতে পারেন দায়িত্বরত কর্মকর্তার সাথে এই নাম্বারে-০১৭৬৯৬৯১৫২২ । ঠিকানাঃ ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স, ৩৬ শহীদ ক্যাপ্টেন মনসুর আলী স্মরণী, রমনা, ঢাকা।

কি কি লাগবেঃ

অভিযোগ করার ক্ষেত্রে অভিযোগের স্বপক্ষে কিছু প্রমাণাদি প্রয়োজন। যেমন এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আলামতের স্ক্রীনশট, লিংক, অডিও/ভিডিও ফাইল অথবা রিলেটেড ডকুমেন্টস। স্ক্রীনশট সংগ্রহের ক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হবে যেন Address Bar এর URL টি দৃশ্যমান হয়। ই-মেইল এর মাধ্যমে অভিযোগ জানাতে চাইলে এসব কন্টেন্ট এটাচ করে আপলোড করতে পারেন। অন্যান্য ক্ষেত্রে সরাসরি সফট কপি দেয়া যেতে পারে। সর্বোপরি প্রয়োজনে Cyber Crime Unit এর অফিসারদের নিকট থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ গ্রহণ করতে পারেন যা আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের সহায়ক হতে পারে।

যদি কোনো কারণে থানা মামলা গ্রহণ না করে সঠিক প্রমাণের অভাবে, কিন্তু আসলে ভিকটিম সত্যি মনে করছেন ভিকটিমের সাথে যা ঘটেছে তা আসলেই সাইবার অপরাধ বা সাইবার ক্রাইম, সেক্ষেত্রে ভিকটিম আইনজীবীর সাথে যোগাযোগ করবেন। আইনজীবী আদালতে মামলা সাবমিট করে দেবে এবং তদন্ত আসবে পুলিশের থানা, সাইবার ক্রাইম ইউনিট, সিআইডি বা পিবিআইয়ের কাছে।

মামলা কবে করা যায়?

ফৌজদারী মামলার ক্ষেত্রে তামাদি আইন (মেয়াদ চলে যাওয়া) প্রযোজ্য নয়। তবে সাজাপ্রাপ্ত আসামীর সাজা কয়েক যুগ পার হলেও তা তামাদি হয়না। যখন গ্রেফতার হবে তখন থেকে তা কার্যকরের সময় গননা হবে।

ফৌজদারী মামলার ক্ষেত্রে অপরাধী যত পুরাতন হোক না কেন বা অপরাধী যত দিনই গা ঢাকা দিয়ে থাক বা নাথাক না কেন অপরাধ যখনই উদ্ঘাটিত বা অপরাধী সনাক্ত হবে তখনই তার বিরুদ্ধে মামলা করা চলবে এবং অপরাধী শাস্তি পাওয়ার যোগ্য হবে। তবে সাধারনত এটাকে স্লান্ডার/লিবেল (মানহানিকর বক্তব্য)ধরলে ক্ষতিপূরণের মামলা এক বছরের মধ্যে করতে হবে।

বিচার:

তবে আইনে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিচার হবে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে। অভিযোগ গঠনের ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে মামলার নিষ্পত্তি করতে হবে। তবে এর মধ্যে করা সম্ভব না হলে সর্বোচ্চ ৯০ কার্যদিবস পর্যন্ত বাড়ানো যাবে।

তবে এটা সত্য যে আইন দিয়ে সবকিছু ঠেকানো যায় না, বিশেষত ধর্মীয় ও নৈতিক অধঃপতনের কারণে মানসিকতা যখন কলুষিত হয়। বলা চলে বাংলাদেশের রোজ নানা রকম অন্যায় অনাচারের ঘটনা ঘটে। সেসব ক্ষেত্রে এই সমালোচনাকারী জনগোষ্ঠীর তেমন কোনো পদক্ষেপ দেখা না গেলেও উদারনৈতিক এবং মানবতাবাদী মানুষের বিরুদ্ধে আঘাত আক্রমণ করতে অবিরাম জিঘাংসা, এমনকি প্রাণনাশের হুমকি দিতেও কেন জানি পিছপা হন না।

বলা হয় যে, যে ইবাদত সকল অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে আপনাকে বিরত রাখতে পারলো না সেই ইবাদত, ইবাদত নয়। সুতরাং তাদের কাছে একটাই অনুরোধ, হে কিবোর্ড যোদ্ধা প্রজন্ম! জ্ঞানচক্ষু খুলুন! সংযত হউন!

 

লেখকঃ ব্যারিষ্টার প্রজ্ঞা
আইনজীবী, ঢাকা জজ কোর্ট।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেইসবুক পেইজ

Spoken English কোর্স

Shares