মঙ্গলবার, ১৯ অক্টোবর ২০২১, ০৪:২৮ পূর্বাহ্ন

এই দুর্যোগের শেষ কোথায়?
আলী ওসমান শেফায়েত, চট্টগ্রাম / ১৯৬ ভিউ
সর্বশেষ আপডেট : মঙ্গলবার, ১৯ অক্টোবর ২০২১

একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ করোনা ভাইরাস ডিজিজ ২০১৯ (কোভিড -১৯)। এ ভাইরাসের সংক্রমণ বর্তমানে বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থার জন্ম দিয়েছে। ৩১শে ডিসেম্বর চীনের উহানে ভাইরাসটি সনাক্ত হওয়ার পর বিশ্বের প্রায় সকল দেশ ও অঞ্চলে এটি ছড়িয়ে পড়েছে। গত ১০৩ দিনে মারা গেছে ১০৩ হাজারেরও বেশি মানুষ এবং প্রতিনিয়ত দীর্ঘ হচ্ছে এ মৃত্যুর মিছিল।

এই উদ্বুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার লক্ষ্যে বিশ্বের প্রতিটি দেশ তার নিজ নিজ সীমারেখার মধ্যে, এমনকি ঐ দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলায়ও নিজ নিজ সীমারেখার মধ্যে অবরুদ্ধ বা লকডাউন নামক কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে মানুষ আজ নিজ নিজ এলাকার মধ্যে সম্পূর্ণ গৃহবন্দী হয়ে পড়েছে।

লকডাউন নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে ভিন্ন ভিন্ন মতামতের স্রোতে ভেসে গেছে পত্রিকার পাতা, টকশো এর পর্দা আর সাধারন মানুষের চিন্তা। কেউ বলছেন, ‘লকডাউন করা উচিত হয়নি’, কেউ বলছেন, ‘লকডাউন ছাড়া উপায় নেই’, আবার কেউ বলছেন, ‘লকডাউন সীমিত আকারে করা দরকার’ ইত্যাদি। এব্যাপারে সরকারি বড় বড় লোকজনের কথাবার্তা শুনে আমি প্রতিদিন কয়েকবার ধপাস করে বিভিন্ন উচ্চতা থেকে মাটিতে পড়ি। উদাহরণস্বরূপ, একই দিনে, মাননীয় বানিজ্যমন্ত্রী বলছেন- “গার্মেন্টস বন্ধ রাখার ব্যাপারে সরকারের কোন নির্দেশনা নেই, মালিক চাইলে স্বাস্থ্যবিধি মেনে খোলা রাখতে পারে।” আবার, সন্মানিত জনপ্রশাসন সচিব বলছেন – “আইন মেনে সবাই যাতে ঘরে থাকে সেই জন্য আইন শৃংখলা বাহিনী আরো কঠিন হবে”। এইরকম সাংঘর্ষিক বক্তব্য এইরকম দুজন দ্বায়িত্বশীল মানুষের কাছ থেকে একই দিনে আসা মানে বড় রকমের সমন্বয়হীনতা বিদ্যমান, যা সকল কার্যক্রমের জন্য ব্যাপক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। সবকিছুতে পর্যালোচনা করে লকডাউন নিয়ে অল্প কথায় আমার ব্যক্তিগত কিছু মতামত উপস্থাপনের চেষ্ঠা করছি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমারও যা যুক্তিযুক্ত মনে হয়, তা হলো কোভিড মহামারীর পুরো ব্যাপারটাই দুটো চরমপন্থী কার্যক্রমের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রন করার চেষ্ঠা করা ছাড়া আর খুব বেশী কিছু করা সম্ভব নয়।

একটি হলো, অত্যন্ত কড়াকড়ি লকডাউনের মাধ্যমে সর্বোচ্চ সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা, অপরটি হলো, লকডাউন না করে সবাইকে বা যত বেশী সম্ভব মানুষকে ভাইরাস সনাক্তকরণের পরীক্ষা বা টেস্ট করতে থাকা।

আমাদের দেশের জনমিতি (ডেমোগ্রাফি), সামাজিক অবস্থা, অবকাঠামোগত প্রস্তুতিহীনতা এবং সর্বোপরি অর্থনৈতিক কারনে সবাইকে বা কোটি কোটি মানুষকে টেস্টিং করার ব্যাপারটা একেবারেই বাস্তবসম্মত নয়। অতএব সম্পূর্ন লকডাউনের মাধ্যমে বাধ্যতামূলক সামাজিক দূরত্ব সৃষ্টি করাই আমাদের একমাত্র বিকল্প। যা করার আপ্রান চেষ্টা সরকারের বিভিন্ন মহল থেকে করা হচ্ছে। আমরা জনগন কতটুকু তা পালন করছি তা বিচার আমাদের নিজেদেরকেই করতে হবে!

জনগনের অবশ্য অনেকরকম সমস্যা আছে। জীবন না জীবিকা? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বলা হলে সহজ, সরল, অংকে দূর্বল, খেয়ালি সাহসী ১৮ কোটি বাংলাদেশী সাধারন জনগনের মধ্য থেকে কমপক্ষে ৯ কোটি ভিন্নমত, ভিন্ন ব্যাখ্যা এলে আমি মোটেই অবাক হব না! আমরা বাঙালী, আমরা এমনই! একটু মাথায় হাত বুলিয়ে, না হলে বুকে জড়িয়ে ধরে বোঝালে আমাদের দিয়ে সবই করানো সম্ভব। কিন্তু করোনার যন্ত্রনায় মাথায় হাত বোলানো বা বুকে জড়িয়ে ধরাটা এখন প্রায় মারনাস্ত্রের সাথে তুল্য। কি হবে তাহলে আমাদের?

আমার ব্যক্তিগত মতামত হলো, এখানে আমরা মনে হয় কিছুটা ইমপ্রোভাইজ করে একটা ব্যালেন্সড আ্যপ্রোচ নিতে পারি। যেহেতু এখন দাম এবং সহজলভ্যতার দিক দিয়ে টেস্টিং কিটের পরিস্থিতির অনেকটা উন্নতি হয়েছে, উল্লেখযোগ্য হারে টেস্টিং এবং সিলেক্টিভ আইসোলেশন বাড়ানো যেতে পারে। বিশেষ করে ষাটোর্ধ জনগোষ্ঠী এবং যারা বিশেষায়িত রোগব্যাধিতে আক্রান্ত, অর্থাৎ যাদের জন্য করোনা ভাইরাস সবচেয়ে বেশী বিপদের কারণ হতে পারে, তাদেরকে ব্যাপক টেস্টিং এবং মনিটরিংয়ের মাধ্যমে বিশেষভাবে আইসোলেশনে রেখে, তরুন বা যুবকদের জন্য লকডাউনে কিছুটা শৈথিল্য প্রয়োগ করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে সাফল্য নিশ্চিত করতে হলে, এই সকল কার্যক্রমের পরিকল্পনা এবং প্রয়োগের সাথে সংশ্লিষ্ট সকলের মধ্যে ব্যাপক সমন্বয় এবং সঠিক প্রযুক্তির ব্যাবহার নিশ্চিত করতেই হবে। তবে এই আ্যপ্রোচটা কিছুতেই চলমান কমপক্ষে তিন (০৩) সপ্তাহের সম্পূর্ন লকডাউন শেষ হবার আগে প্রয়োগ করা যাবে না। করোনার ভাইরাসের ব্যাপকতা নিয়ন্ত্রনযোগ্য অবস্থায় রাখতে, অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্ভাবনাকে মেনে নিয়ে কমপক্ষে তিন সপ্তাহ কড়াকড়ি লকডাউনের কোন বিকল্প নেই। তিন সপ্তাহের বেশী কমপ্লিট লকডাউন হলে আমরা অর্থনৈতিক সমস্যার পাশাপাশি সামাজিক এবং গনহারে মানসিক সমস্যায় পড়ে যেতে পারি। তবে সবার আগে আমাদেরকে নিশ্চিত করতে হবে যেন করোনার বিস্তার অনিয়ন্ত্রনযোগ্য পর্যায়ে চলে না যায়। অতএব, এই মূহুর্তে চলমান লকডাউন কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতেই হবে, প্রত্যেককেই!

যদি আগামী তিন সপ্তাহে বড় ধরনের কমিউনিটি সংক্রমন ঠেকানো না যায়, তাহলেই কেবল লকডাউন বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে। তবে ভাইরাসটির বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষন এবং এখন পর্যন্ত উপমহাদেশে করোনার বিস্তারের গতিপ্রকৃতি এবং আমাদের সরকারের উদ্যোগসমূহ থেকে আশা করা যায় যে কমিউনিটি সংক্রমন মোটামুটি সহনীয় পর্যায়ে রাখা সম্ভব হবে ইনশাল্লাহ। বাস্তবতা হলো, আমাদের মতো দেশে লকডাউন দীর্ঘায়িত হলে বিভিন্ন স্তরে সামাজিক অস্থিরতা বাড়বেই। অতএব, আগামী কিছুদিন কঠোর সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে না পারলে মহাবিপদ হয়ে যেতে পারে – এই কথাটা সবাইকে আত্মস্থ করতেই হবে।

আরেকটা ব্যাপারে আমাদেরকে এখনই গুরুত্ব সহকারে পরিকল্পনা গ্রহন করতে হবে, তা হলো – মানসিক স্বাস্থ্য। আতংক, আইসোলেশন, সামাজিক দূরত্ব ইত্যাদি বিভিন্ন কারনে বিভিন্ন বয়সী মানুষের মধ্যে মানসিক সমস্যা দেখা দিতেই পারে। অতি সম্প্রতি ব্রিটিশ সাইকিয়াট্রিক এসোসিয়েশনের একটি প্রতিবেদন দেখা যায়, ইতিমধ্যেই করোনা আতংকের কারনে ব্রিটিশ জনগনের মধ্যে হতাশা, নেশাগস্থতা, আত্মহত্যা, সহিংস মানসিকতা ইত্যাদি আশংকাজনক হারে বেড়ে যাচ্ছে। যদিও আমাদের আর্থসামাজিক বাস্তবতা ব্রিটিশদের থেকে অনেক ভিন্ন, তবুও এখনই এ ব্যাপারে পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি না নিলে পরবর্তীতে তা আমাদের জন্য অতিরিক্ত মাথাব্যথার কারন হয়ে দাঁড়াতে পারে। আমি নিজে ব্যক্তিগতভাবে গত কয়েকদিন রাস্তাঘাটে এমনকি সোশ্যাল মিডিয়াতেও মানুষের ব্যবহারে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন লক্ষ্য করেছি। মানুষের মধ্যে অন্যরকম একটা ভয়, অনিশ্চয়তা, হতাশা জেঁকে ধরছে।

আরও একটা কারনে মানসিক স্বাস্থ্যের ব্যাপারে আমাদের বিশেষ গুরুত্ব দেয়া উচিত, আর তা হলো – রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে মানসিক সুস্বাস্থ্যের বিশেষ ভূমিকা। একাধিক গবেষনায় প্রমানিত হয়েছে যারা মানসিকভাবে শক্ত এবং উৎফুল্ল থাকেন, তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও অনেক শক্ত এবং কার্যকরী হয়। অতএব, আমরা যদি মানসিক সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত না করি, তাহলে ভাইরাস সংক্রমনের আশংকা অনেকাংশেই বেড়ে যেতে পারে এবং ক্ষতির পরিমানও বেশী হতে পারে। পাশাপাশি দ্বায়িত্বশীল সবাইকে সমাজের বিভিন্ন স্তরে আতংক ছড়ানো নিয়ন্ত্রন করে বেশী করে পজিটিভ ম্যাসেজ পৌঁছে দিতে হবে।এ ব্যাপারে এখনই জোরালো এবং পরিকল্পিত পদক্ষেপ নেয়াটা সকলের জন্যই বিশেষভাবে উপকারী হবে বলে আমার বিশ্বাস।

পরিশেষে বলতে চাই, মানবজাতির সাম্প্রতিক ইতিহাসে একটা লাল দাগ কেটে এই দুর্যোগ খুব শীঘ্রই কেটে যাবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। অল্প সময়ের মধ্যেই এই ভাইরাস মোকাবিলায় কার্যকরী ঔষধ চলে এসেছে (কুইনাইন ও অ্যাজিথ্রোমাইসিন) বা আরও আসছে আগামী এক দুই মাসে। বাংলাদেশ সহ সব দেশই স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামোগত উন্নতি নিশ্চিত করার সর্বোচ্চ চেষ্ঠা করছে। এবং আগামী ১২ থেকে ১৮ মাসের মধ্যে এই ভাইরাসের সর্বজনস্বীকৃত প্রতিষেধক সর্বত্র ব্যবহারযোগ্য হয়ে যাবে। ইনশাল্লাহ ২০২১ এর শেষ দিকে বা ২০২২ নাগাদ এই ভাইরাসের কথা সবাই ভুলে যাবে। মাঝের এই বিক্ষুব্ধ সময়টা আমাদের সবাইকে শক্ত হয়ে, কাঁধে কাঁধ রেখে, একে অপরের শক্তি হয়ে দৃঢ়তার সাথে পার করতে হবে। জয় আমাদের সময়ের ব্যাপার মাত্র।

 

লেখক: আলী ওসমান শেফায়েত,
শিক্ষার্থী, সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজ, চট্টগ্রাম।

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
Shares