মঙ্গলবার, ০২ মার্চ ২০২১, ১০:৩৯ পূর্বাহ্ন

একদিকে করোনাভাইরাসের করাল থাবা অন্যদিকে প্রকৃতির নবরূপ ধারণ

মোহাম্মদ মন্‌জুরুল আলম চৌধুরী

বিশ্বব্যাপী প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের সর্বগ্রাসী আগ্রাসনের কারণে সারা বিশ্বের মানুষ আজ অবরুদ্ধ। ঘর বন্দী হয়ে সময় কাটাচ্ছে। এর ব্যতিক্রম নয় বাংলাদেশও।

আর এতেই যেন রূপসী বাংলার হারানো রূপ, প্রকৃতি, ঘন সবুজ পরিবেশ প্রতিবেশ আর জলজ ও জীব-বৈচিত্র্য স্বরূপে, স্বমহিমায় ফিরতে শুরু করছে। প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে পশু, পাখী, কীট-পতঙ্গ, মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীর প্রাণে।

রাস্তায় যানবাহন চলাচল নেই। নেই সেই চিরচেনা অসহনীয় অসহ্য যানজট, কোলাহ্ল, যানবাহনের বিকট শব্দের পাশাপাশি অহেতুক হর্নের মাত্রাতিরিক্ত শব্দ-দূষণ। রাস্তায় উড়ছে না ধুলাবালি। থমকে গেছে রাস্তায় যত্রতত্র খোঁড়াখুঁড়ির নাগরিক ভোগান্তি দুঃখ দুর্দশা ও দুর্ভোগ। থেমে গেছে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের পাশাপাশি ব্যাক্তিগত ঘরবাড়ি নির্মাণের কাজ। ফলশ্রুতিতে বাতাসে নেই ধুলাবালির উৎপাত। নেই ইটভাটার আগুনের ধোঁয়ার পাশাপাশি কল কারখানা, যানবাহন, জেনারেটারের কালো আর বিষাক্ত ধোঁয়া। ফলশ্রুতিতে সারাদেশে বায়ু দূষণ কমেছে। তাছাড়া এখন দুর্বৃত্তদের পাহাড় কাটা নেই। নেই অবৈধভাবে বনের গাছ কাটার মহাযজ্ঞ। নদীতে গিয়ে পড়ছে না বাজারের বর্জ্য, কৃষি বর্জ্য, কল কারখানার অপরিশোধিত দূষিত শিল্প বর্জ্য। নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন হচ্ছে না। হচ্ছে না অবৈধ নদী দখল। নৌযান চলাচল বন্ধ থাকায় নদীতে নৌযানের পোড়া মুবিলসহ বিভিন্ন বর্জ্য নদীর পানিকে দূষণ করছে না। মাছের আনাঘোনায় ঘটছে না কোনো ব্যাঘাত।

পাশাপাশি দেশের বৃহত্তম সৈকত কক্সবাজার গত ১৮ মার্চ’২০ থেকে বন্ধ থাকায় সাগরে দূষণ কমেছে। সাগরে নেই পর্যটক বা মানুষের অহেতুক উৎপাত ও যন্ত্রণা। ফলশ্রুতিতে সাগরে দূষণ কমায় পানি স্বচ্ছ এবং পরিষ্কার হওয়ার পাশাপাশি জলজ জীব-বৈচিত্র্যে এসেছে প্রাণচাঞ্চল্য। কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে এখন গোলাপীসহ বিভিন্ন ধরণের ডলফিন দল বেঁধে অতি নিকটে এসে খেলা করছে। পানিতে নির্ভয়ে নির্বিঘ্নে ভেসে বেড়াচ্ছে। পাশাপাশি বন জংগল আর পাহাড় পর্বতে পশু পাখি কীট পতঙ্গের মধ্যেও ফিরেছে প্রাণচাঞ্চল্য। তারা যেন তাদের সেই হারানো বিলুপ্ত অভয়ারণ্য আবার ফিরে পেয়েছে। গাছ নিধন বন্ধ হওয়ায় প্রকৃতি যেন ঘন সবুজে নবরূপে সজ্জিত হয়েছে। বায়ুমণ্ডলে কার্বন নিঃসরণ কমতে শুরু করেছে। ওজোন স্তরের পরিবর্তন ঘটছে। বায়ুমণ্ডল দিন দিন স্বচ্ছ আর পরিষ্কার হচ্ছে। দূষণমাত্রা কমে মানুষের নিঃশ্বাসে টেনে নেয়ার মতো বিশুদ্ধ আর পরিশুদ্ধ হয়ে উঠছে। সবুজ ঘণ নব পল্লবে পল্লবিত সবুঝ গাছ গাছালী বন বাদাড়। আর অপেক্ষায় আছে বৃষ্টিধারার।

আমাদের প্রকৃতির ওপর নির্দয়, নির্মম, নিষ্ঠুর আচরণের কারণে বন উজাড় হয়েছে, নির্বিচারে পাহাড় কাটা হয়েছে, নদী ভরাট, দখল ও দূষণ হয়েছে, শব্দ দূষণ, বায়ু দূষণ, পানি দূষণসহ পরিবেশ প্রতিবেশের অপরিসীম ক্ষতি সাধন হয়েছে। ফলশ্রুতিতে প্রকৃতি রুদ্র, রূঢ়, বিরূপ আচরণ করেছে। আগাম বৃষ্টি, অতি বৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, খরা, বায়ুমণ্ডলের উষ্ণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। বন্যার পানিতে দেশের নিম্নাঞ্চল বারবার প্লাবিত হয়েছে, ঝড় বৃষ্টি ঘূর্ণিঝড় হয়েছে, জলোচ্ছ্বাস হয়েছে। যা মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে বারবার ব্যাঘাত ঘটিয়েছে। জীবনযাত্রাকে করেছে বিপন্ন। যা মানুষের দুঃখ দুর্দশা দুর্ভোগ ভোগান্তি বাড়িয়েছে। পাশাপাশি দীর্ঘদিন বায়ু দূষণের মধ্যে থাকার ফলে মানুষের ফুসফুসের ক্যান্সার এবং হৃদরোগে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে। এমনকি সেটা মস্তিষ্ক, লিভার বা কিডনির দীর্ঘমেয়াদি সমস্যাও তৈরি করতে পারে এমন অভিমত বিশেষজ্ঞদের। তাছাড়া শুক্রাণুর ক্ষতি, জন্মগত ত্রুটি , স্ট্রোকের ঝুঁকি, কিডনির রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব পড়ে বলেও তাঁদের অভিমত। এছাড়া উচ্চ শব্দের কারণে হাইপার-টেনশন, শ্বাস-কষ্ট, আলসার, হৃদরোগ, হজমে ব্যাঘাত, মাথাব্যথা বা স্নায়ুর সমস্যা হতে পারে। এমনকি অতিরিক্ত শব্দের পরিবেশে থাকলে শিশুর জন্মগত ক্রুটির তৈরি হতে পারে। এক তথ্য থেকে জানা যায়, “বাংলাদেশে প্রতি বছর যতো মানুষের মৃত্যু হয় তার ২৮ শতাংশই মারা যায় পরিবেশ দূষণ জনিত অসুখবিসুখের কারণে। কিন্তু সারা বিশ্বে এধরনের মৃত্যুর গড় মাত্র ১৬ শতাংশ”।

ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস বায়ুবাহিত প্রাণঘাতী মহামারী করোনাভাইরাসের কারণে মানুষ একদিকে গৃহবন্দী অন্যদিকে এই গৃহবন্দী মানুষের কারণে তথা তাঁদের প্রকৃতির ওপর নির্মম নির্দয় নিষ্ঠুর অত্যাচার বন্ধ হওয়ার কারণে সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা বাংলাদেশের অপরূপ প্রকৃতি, পরিবেশ, প্রতিবেশ আদিরূপে ফিরে আসার পাশাপাশি জলজ ও জীব-বৈচিত্র্যে ফিরে এসেছে প্রাণচাঞ্চল্য। পৃথিবী হয়ে উঠছে শুদ্ধ পরিশুদ্ধ শুভ সুন্দর যা প্রকৃত অর্থেই মানুষের বাসোপযোগী। মানুষ ফিরে পেয়েছে প্রাণভরে নির্মল নিরোগ সজীব প্রাণবন্ত নিঃশ্বাস নেওয়ার মতো বায়ুমণ্ডল। মহান আল্লাহ্‌র দরবারে এই প্রাণঘাতী মহামারী থেকে উদ্ধার পাওয়ার প্রার্থনা করি কায়োবাক্য মনে। প্রত্যাশা করি করোনাভাইরাস দেশের পরিবেশ প্রতিবেশ ও প্রকৃতি রক্ষার কঠিন মূল্যের বিনিময়ে যে শিক্ষা দিয়ে গেল তা যেন আমরা ভুলে না যাই। একথা ভুলে গেলে চলবে না গেল বছরের শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় বুলবুলসহ অতীতের অনেক বড় বড় ঘূর্ণিঝড়ের তান্ডব থেকে দেশ ও জাতিকে রক্ষা করছে দেশের বৃহত্তম বনাঞ্চল সুন্দরবন। অতএব মানুষের স্বার্থেই প্রকৃতি, পরিবেশ ও প্রতিবেশকে রক্ষা করার আর কোনো বিকল্প নেই।

মোহাম্মদ মন্‌জুরুল আলম চৌধুরী : লেখক ও কলামিস্ট
email: m.monju@yahoo.com


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেইসবুক পেইজ

Spoken English কোর্স