বৃহস্পতিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০১:৪০ পূর্বাহ্ন

করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ও মধ্যবিত্তদের দুর্গতি
মোঃ এরফান আলী, লেখক / ২৫৮ ভিউ
সর্বশেষ আপডেট : বৃহস্পতিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১

করোনা ভাইরাসের প্রভাবে সারা বিশ্বের ন্যায় আমাদের দেশ চরম সংকটের মধ্যে পতিত হয়েছে। সারাদেশে লকডাউন চলছে। উচ্চবিত্তরা নিজেদের জমানো টাকায় বেশ আয়েশী ভাবেই গৃহে অবস্থান করছেন। নিম্নবিত্তরা সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যাক্তি উদ্যোগে ত্রাণ, টিসিবির ভর্তুকি মূল্যের পণ্য সহ বিভিন্ন সাহায্য সহযোগিতা পাচ্ছেন কিন্তু মধ্যবিত্তদের খবর কি কেউ রাখছেন? কেমন আছেন তারা। তবে মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে কারা অন্তুর্ভুক্ত সে বিষয়ে আমাদের সাম্যক ধারণা থাকা প্রয়োজন। প্রথমেই আমরা জেনে নিই এই শ্রেণি ব্যবস্থার বকভাবে উৎপত্তি হলো।

কালের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক স্তরবিন্যাসের আকৃতি-প্রকৃতির পরিবর্তন হয়েছে। অধিকাংশ সমাজবিজ্ঞানী সামাজিক স্তরবিন্যাসের নিন্মোক্ত চারটি ধরনের উল্লেখ করেছেন। যথা- ক) দাস ব্যবস্থা, খ) সামন্ত বা এস্টেট ব্যবস্থা, গ) শ্রেণী ব্যবস্থা এবং ঘ) বর্ণ বা জাতিপ্রথা।

দাস ব্যবস্থা:
দাস ব্যবস্থা একজন মানুষকে অপর একজন মানুষের ওপর মালিকানা আরোপের অধিকার দেয়। কার্ল মার্কসের মতে, দাস ব্যবস্থাই প্রথম শ্রেণীভিত্তিক শোষণমূলক সমাজব্যবস্থা।

এস্টেট ব্যবস্থা:
ভূমিস্বত্বকেই ইংরেজিতে বলা হয় ‘Estates’। যার অর্থ জমিদারের মালিকানাধীন জমি। এই ব্যবস্থায় কোন দল বা ব্যক্তি রাষ্ট্র থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ ভূখন্ড পেয়ে তাতে আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করত। এস্টেট ব্যবস্থায় তিন সামাজিক স্তর বিন্যাস পরিচালিত ছিল।

বর্ণ প্রথা:
বর্ণ বা জাতি প্রথার ইংরেজি প্রতিশব্দ ‘Caste’ শব্দটি এসেছে পর্তুগীজ শব্দ ‘Casta’ থেকে, যার অর্থ বংশধর, কূল বা জাতি। সুতরাং জাতি বা বর্ণের ভিত্তিতে সৃষ্ট বিভাজন হচ্ছে বর্ণপ্রথা। হিন্দুদের ধর্মীয় শাস্ত্রে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য এবং শুদ্র এই চারটি বর্ণের উল্লেখ করা হয়েছে। উল্লেখিত চারটি বর্ণ আবার অসংখ্য উপবর্ণে বিভক্ত।

আধুনিক শ্রেণী ব্যবস্থা:
শ্রেণী সম্পর্কে লেলিন বলেছেন, ‘শ্রেণী হচ্ছে পরস্পর বিপরীত স্বার্থ নির্ভর দু’টি গোষ্ঠী, যাদের এক শ্রেণী অন্য শ্রেণীকে শোষণ করে।’ শ্রেণী ব্যবস্থাকে সমাজবিজ্ঞানীরা উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্ত শ্রেণী- এই তিনটি ভাগে বিভক্ত করেছেন। উচ্চবিত্ত হচ্ছে যাঁরা অধিক সম্পদের মালিক। মধ্যবিত্ত হচ্ছে যাদের খুব বেশি সম্পত্তি নেই, কিন্তু অন্যের সাহায্য গ্রহণেরও প্রয়োজন হয় না। আর নিম্নবিত্ত হচ্ছে শ্রমজীবী শ্রেণী, যাদের তেমন কোন অর্থ সম্পত্তি নেই। মধ্যবিত্তের মধ্যে আবার তিনটা শ্রেণি আছে। উচ্চ-মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত।

বর্তমান রাষ্ট্র ব্যবস্থায় নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তসহ সব মানুষের জীবন নির্বাহ করা অত্যন্ত কষ্টের। বিশেষ করে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের দাম ক্রমান্বয়ে যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে মধ্যবিত্ত মানুষের আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে। বাড়িভাড়া বৃদ্ধি বা কমানো সংক্রান্ত কোনো গ্রহণযোগ্য সরকারি নীতিমালা না থাকায় বাড়ির মালিকরা যে কোনো ছুঁতোয় বাসাভাড়া বাড়িয়ে দেন। ফলে বাসা ভাড়ার চাপ গুণতে হয় মধ্যবিত্তদের। ধনী ও দরিদ্রের বৈষম্য ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনিয়ম, ঘুষ ও দুর্নীতির কারণে অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধাগুলো কতিপয় নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর হাতে চলে যাচ্ছে। এতে চরমভাবে উপেক্ষিত হচ্ছে আপামর সাধারণ মানুষ। ফলে এই শ্রেণিভুক্ত স্বার্থান্বেষী সামাজিক পরিবর্তনের সঙ্গে তারা খাপ খাওয়াতে ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে কখনো নীরব আবার কখনো সরবে নিশ্চিতভাবে ভেঙে পড়ছে সামাজিক মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও সংস্কৃতির ভাবধারা ও ঐতিহ্য। যা আমাদের বিকশিত মধ্যবিত্তসম্পন্ন মানুষের জীবনে বড় আঘাত।

কিন্তু এই মধ্যবিত্ত কারা? সংজ্ঞা কী মধ্যবিত্তের? এ প্রশ্নের কোনো সর্বজন স্বীকৃত ও গ্রহণযোগ্য উত্তর নেই। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস), এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) বিচ্ছিন্নভাবে মধ্যবিত্ত নিয়ে গবেষণা করার চেষ্টা করেছে, তবে তা কেবলই আর্থিক পরিমাপ দিয়ে।

অর্থনীতিবিদ ও সমাজ বিশ্লেষকরা বলছেন, একজন মানুষ দৈনিক ২১২২ কিলোক্যালরির কম খাদ্য গ্রহণ করলে কিংবা দৈনিক আয় ১.৯২ ডলারের কম হলে তাকে দরিদ্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। দারিদ্র্যসীমার এই সংজ্ঞা বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত।
ড. ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ মনে করেন, মধ্যবিত্তের সংজ্ঞা শুধু মাথাপিছু আয় দিয়ে ধরা ঠিক হবে না। আয় ছাড়াও জীবনমানের অন্য সব বিষয়ও আনতে হবে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সেবা সঙ্গে আনতে হবে। মধ্যবিত্তের একটা সাংস্কৃতিক মানদণ্ডও থাকা উচিত।
পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) চেয়ারম্যান ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ মনে করেন, যাদের ন্যূনতম থাকার জায়গা আছে, খাওয়াদাওয়ার জন্য কারো কাছে হাত পাততে হয় না, সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে পারছে, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পারছে—তাদের মধ্যবিত্তের কাতারে ফেলা যেতে পারে।

কোন কোন সমাজ বিজ্ঞানী পেশা বিবেচনায় শ্রেণি বিন্যাস করেছেন। নির্দিষ্ট কিছু পেশার লোকজনকে মধ্যবিত্তের কাতারে ফেলেছেন আর শ্রমজীবীদের নিম্নবিত্তের কাতারে অন্তর্ভুক্ত কেরেছেন। এ পদ্ধতির বেশ সমালোচনাও রয়েছে যেমন: একজন কারখানা শ্রমিক বা দোকানীর আয়ও একজন স্কুল শিক্ষকের চেয়ে বেশি।

আলোচনা সমালোচনা যতই থাকুক না কেন সমাজে এই মধ্যবিত্ত শ্রেণির একটি বিশেষ অবদান রয়েছে। রেমিট্যান্স প্রেরণের ক্ষেত্রেও তাদের ভূমিকাই অগ্রগণ্য। এই দুর্যোগের মুহূর্তে তারা কিন্তু কারো নিকট হাত পাততে পারছেন না। দেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখতে মাননীয় প্রধান মন্ত্রী বিশাল একটি আর্থিক প্রণোদনার প্যাকেজ ঘোষণা করলেও কৃষি খাতে কোন প্যাকেজ ঘোষিত হয়নি। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্তদের একটি বৃহৎ অংশ সরাসরি কৃষির সাথে জড়িত। এই ক্রান্তিলগ্নে বিশাল এই শ্রেণির মানুষকে সুরক্ষা দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব।এই শ্রেণিকে কিভাবে আমরা সহযোগিতা করতে পারি তা আমাদের নীতি নির্ধারকদের ভাবতে হবে। এতবড় একটি শ্রণিকে অভুক্ত রেখে কিন্তু দেশ ভালো থাকতে পারে না।

আর্থিক সংকট ও দীনতায় জর্জরিত থাকা সত্ত্বেও সমাজের নিকট প্রতিনিয়ত ভালো থাকার অভিনয়কারী এই শ্রেণির মানুষ আজ ভালো নেই। নিম্নমধ্যবিত্তদের অনেকেই পেটের ক্ষুধা নিবৃত্ত করতে না পেরে নিম্নবিত্তের সারিতে দাঁড়িয়ে ত্রাণ যোগাড় করছেন। শুধু সরকারের উপর নির্ভরশীল না হয়ে আমাদের উচিত প্রতিবেশীদের দিকে খেয়াল রাখা।

লেখক:
মোঃ এরফান আলী,
পরিচালক, মৌসুমী এনজিও, নওগাঁ।

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
Shares