শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:৪৬ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
সাভারে স্কুলছাত্রী নীলা হত্যাকান্ডে মিজানের বাবা মা আটক সাতক্ষীরায় পানিবন্দী মানুষের অবস্থান কর্মসূচি ও মানববন্ধন তুরাগ নদী থেকে অজ্ঞাত যুবকের লাশ উদ্ধার সাভার, আশুলিয়া ও ধামরাইয়ে বিভিন্ন অপরাধীদের নামে ৪’শ ২৮টি মামলা নন্দীগ্রামে খাস পুকুরে পানি নিষ্কাশন নিয়ে মারামারি, আহত ২ শেকৃবিতে রেজিস্ট্রারকে চলতি ভিসির দ্বায়িত্ব দেওয়ায় বশেমুরবিপ্রবি শিক্ষক সমিতির নিন্দা তাহিরপুরে অজ্ঞাত বৃদ্ধার ঠিকানা খুঁজছে এলাকাবাসী নিবন্ধন না থাকায় সাভারে বিভিন্ন হোটেল ও রেস্টুরেন্টকে ১ লক্ষ ৭০ হাজার টাকা জরিমানা আশুলিয়ায় স্কুল পড়ুয়া কিশোরকে পিটিয়ে হত্যা, সাভারে ২ জনের লাশ উদ্ধার পাটগ্রামে ভারতীয় শাড়ী ও কসমেটিক্স সহ আটক ২

করোনা ভাইরাস এবং লকডাউনের দিনগুলি

রহিম উদ্দিন, কবি ও প্রাবন্ধিক

  • “চলাচলকারী পথচারী, নিতম্ব প্রধান নারী
    উড্ডীন পতাকাসহ খাদ্যমন্ত্রী ও মন্ত্রীর গাড়ী
    আমার ক্ষুধার কাছে কিছুই ফেলনা নয় আজ
    ভাত দে হারামজাদা,
    তা না হলে মানচিত্র খাবো।”

সদ্যোজাত স্বাধীন বাংলাদেশের ১৯৭৪ সালের মার্চ হতে ডিসেম্বর পর্যন্ত ক্ষুদার্ত ও পীড়িত মানুষ এবং দুর্ভিক্ষের প্রেক্ষাপটে কবি রফিক আজাদ রচিত অন্যতম কবিতা ‘ ভাত দে হারামজাদা ‘র অংশবিশেষ অবতারণার মধ্যে দিয়েই আমার ‘ করোনা ভাইরাস এবং লকডাউনের দিনগুলি ‘ আলোকপাত করবো।

১.
করোনার বিষয়ে দৃষ্টিপাত করার জন্য আমাদের প্রথমেই অবগত হওয়া উচিত, বৈশ্বিক মহামারি করোনার উৎপত্তি ও বাংলাদেশে করোনার আগমন সম্পর্কে। ৩১ শে ডিসেম্বর ২০১৯ খ্রিস্টাব্দে চীনের উহান প্রদেশে করোনার উৎপত্তি তথা জন্ম। সেই হিসেবে করোনার বয়স প্রায় তিন মাসের পেরিয়ে চতুর্থ মাস ছুয় ছুয়। বর্তমানে করোনার সর্বশেষ পরিস্থিতি যদি বলি, সারাবিশ্বে মোট আক্রান্ত পাঁচ লাখের বেশি এবং মৃতের সংখ্যা পঁচিশ হাজারের বেশি। আমাদের দেশে মৃতের সংখ্যা পাঁচ এবং আক্রান্তের সংখ্যা পঞ্চাশের ঘরে। শুধু তাই নয়, এই সংখ্যা যেমন এক দিকে হু হু করে বাড়ছে, অন্যদিকে একদেশকে পাল্লা দিয়ে ছাড়িয়ে যাচ্ছে অন্যদেশ এবং আক্রান্ত দেশের সংখ্যা। যে চীনে করোনার উৎপত্তি সেই চীনকে ছাড়িয়েছে কিছু কিছু দেশ। তারমধ্যে ইতালি যুক্তরাষ্ট্র উল্লেখ্য। তবে, এখানেই জানার বিষয়, আমাদের অবস্থা কী! হ্যাঁ, এই বিষয়ে বলতে, আমাদের অবস্থা নট বেড। যেখানে বিশ্বের করোনায় মৃতের হার পাঁচ দশমিকের ঘরে সেখানে আমরা আছি দশ দশমিকের উপরে।

২.
করোনা ও করোনাকালীন শব্দ বিভ্রাটে ভুগছে বাংলাদেশ। অবশ্যই বাংলাদেশের কথা বলার আগে বিশ্ব নেতাদের কথা কিছুটা বলে নিই। কিছুদিন আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী দুজনে বিশ্বকে যা উপহার দিয়েছে সেই হিসেবে আমাদের ক্ষেত্রে শব্দ বিভ্রাট ও উচ্চারণের বিভ্রান্তি স্বাভাবিক। মার্কিন প্রেসিডেন্ট স্বামী বিবেকানন্দ’র নাম উচ্চারণ করতে গিয়ে যেমন বলেছেন, বি বে কমানান্ডো; তেমনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিজীও মার্কিন প্রেসিডেন্টের নাম ঘোষণায় বলেছেন, ‘ ডোলান ট্রাম্প! ‘ সেই স্বাভাবিকতার পথ ধরেই কী আমরা বাঙালিরা, ‘ ক-রো-না ‘ কে ‘ করুণা ‘ বলছি কিনা আমার জানা নেই। নাকি এ কেবল আমাদের অপারগতা ও দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ। দুঃখজনক হলেও সত্যিই বাংলাদেশের মিডিয়া ব্যক্তিত্ব থেকে শুরু করে উচ্চপদস্থ অনেকেই করোনাকে করুণা বলে চালিয়ে যাচ্ছে। সেখানে,আমরা, সাধারণ আমজনতা, ‘ কোয়ারেন্টেইন’ এবং ‘ লকডাউন ‘ শব্দ গুলোর পরিবর্তে বাংলা শব্দের ব্যবহার চাওয়া অযোক্তিক নয়, যদিও বিষয়টি হাস্যকর এবং লজ্জাকর। অন্যদিকে হতে পারে এটাই আমাদের বাঙালিয়ানা।

৩.
বাংলাদেশে ৮মার্চ ২০২০ খ্রিস্টাব্দে সর্বপ্রথম করোনা ভাইরাস আক্রান্ত রোগী সনাক্ত করা হয়। তখন করোনা আক্রান্ত দেশের সংখ্যা ১০৩। বর্তমানে করোনা আক্রান্ত দেশের সংখ্যা ২০০ এর কাছাকাছি। এমতাবস্থায়, গত ২৬ মার্চ ২০২০ খ্রিস্টাব্দ হতে বিশ্বের অন্যান্য লকডাউন কৃত গুটিকয়েক দেশের ন্যায় বাংলাদেশও কার্যত বিচ্ছিন্ন ও বন্দী। যদিও এদেশে সরকার মানুষের চলাফেরার উপর লকডাউনের পরিবর্তে গণপরিবহনে লকডাউন ঘোষণা করেছে। এতেই আমরা কাবু হয়েগেছি। হয়েগেছি, হয়েগেছি অঘোষিত গৃহবন্দী। এতেও যদি এই মহামারি ভাইরাস হতে মুক্তি পাওয়া যায়,তাতেই আমরা খুশি। কথাহলো, লকডাউন এবং জরুরি অবস্থা তথা ১৪৪ ধারা এককথা নয়। প্রশাসন ও সরকার বারবার জনগণকে বলছে ঘরের মধ্যে থাকেন, হাঁচি-কাশির শিষ্টাচার মেনে চলুন। বিনা প্রয়োজন ঘরের বাহির হবেন না। গণজমায়েত করবেন না। শুধু তাই নয়, এরমধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যাংকিং কার্যক্রম চালু রাখা, মুদির দোকান,ফার্মেসি, এবং কাঁচাবাজার খোলা রাখারও নির্দেশনা সরকার দিয়েছে। এইছাড়াও, পপণ্যবাহী পরিবহনের উপর লকডাউনের প্রভাব বিলুপ্তি করেছে। ফলশ্রুতিতে আমরা বলতে পারি, বিনাপ্রয়োজনের বিপরীতে প্রয়োজন হলে অবশ্যই দুয়েকজন মানুষও ঘরের বাইরে যেতে পারি। এমতাবস্থায়, সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও ম্যাজিস্ট্রেট মহোদয়গণ সাধারণ জনগণকে যেরুপে রাস্তাঘাটে কায়িকশাস্তি ও আর্থিকশাস্তি প্রদান করছে তার সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ও আইনি গ্রহণযোগ্যতা কতটুকু? ফেইসবুকের মাধ্যমে কিছু কিছু ছবি ভাইরাল হয়েছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সাধারণ জনগণকে কানে ধরিয়ে উঠাবসা করাচ্ছে, সাইকেল হাতে নিয়ে উঠাবসা করাচ্ছে। শুধু কি তাই, এই কাতারে আছে ম্যাজিস্ট্রেটও। সেও আমি মেনে নিলাম, কিন্তু, সেই ম্যাজিস্ট্রেট কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কতিপয় সদস্য যদি সেই দৃশ্য মোবাইলে ধারণ করে অথবা অন্য সাধারণ একজন মানুষ ধারণ করে ইন্টারনেটের মাধ্যমে ফেইসবুকে ছড়িয়ে দেয়, তা মানি কী করে। যারা এই মহামারীর মধ্যে রাস্তায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য আছে জেনেও কিংবা গণপরিবহন নাই জেনেও রাস্তায় নেমেছে তারা কি সাধে নেমেছে? তাদের প্রয়োজনটা কোথায়? তাদের দুঃখটা কোথায় অথবা অপরাধটা কোথায়? সরকারের এই প্রশ্নের সদুত্তর আছে কী?

৪.
কোভিড-১৯ করোনা ভাইরাসকে গত ১১ মার্চ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বৈশ্বিক মহামারি ঘোষণা দিয়েছে। আমার কথা হলো, এই প্রজন্মের তরুণ ও যুবক যাদের বয়স ৩৫ এর মধ্যে সীমাবদ্ধ তারা মহামারীর কতটুকু বুঝে? ঠিক একইভাবে রাষ্ট্রযন্ত্রে নিয়োজিত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদেরও বুঝা উচিত। এখন, চলছে বৈশ্বিক মহামারি। এখানে মানুষের অভাব আর অভাব। চারিদিকে হাহাকার। সুতরাং, নিম্নায়ের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কেউ প্রয়োজন ব্যতিত অহেতুক ঘর থেকে বের হয় না। আবার, সামর্থ্যবাব কেউ ইচ্ছে করলেও কিংবা অটেল ধনসম্পদের মালিক হলেও এককভাবে এই বৈশ্বিক মহামারি কাটিয়ে উঠা সম্ভব না। এই মুহুর্তে যেটা সবচেয়ে বেশি জরুরি সেটা হলো আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা। এখানে এককভাবে না সরকার,না কোন প্রতিষ্ঠান, না কোন ধনকুবের আমাদের এই মহামারি থেকে রক্ষা করতে পারে। যদি কেউ পারে, তিনি একমাত্র সর্বশক্তিমান আল্লাহ। সেই বিশ্বাস রেখেই আমাদের সকল কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। দেশের এহেন পরিস্থিতিতে যেমন সরকার জনগণের সকল চাওয়া পাওয়া পূরণ করতে পারবে না, তদ্রুপ জনগণও সরকারের সকল নিয়মকানুন মেনে চলতে পারবে এটা আশাকরা বোকামি। লকডাউনের এই বাংলাদেশে ইতোমধ্যে অনেকের বাসায় খাদ্য সামগ্রীর স্টক ফুরিয়ে গেছে। আবার যারা নিম্ন আয়ের মানুষ তাদের অনেকের কাছে এখনো সরকার কিংবা অন্যকোন সংঘটনের পক্ষ থেকে কোন রুপ খাদ্য সামগ্রী ও সাহায্য সহযোগিতা পৌঁছায়নি। শুধু কী তাই, এসব সমস্যার মধ্যে একটা ব্যতিক্রম সমস্যার কথা বলি। বর্তমানে অনেক জায়গায় দেখা দিয়েছে খাবার পানির সংকট। তাছাড়া, কিছু কিছু ডাক্তার কিংবা মেডিকেল এখন স্বাভাবিক রোগীদেরও চিকিৎসা দিতে অনীহা প্রকাশ করছে। এই সময়ের তাই বাঙালি জাতির শিক্ষিত ও ফেইসবুক, ইউটিউব ও টকশোবোদ্ধা, ভাইদের প্রতি অনুরোধ, কোন দেশে কে কী করেছে, আমাদের দেশে কে কী করেছে, এসব পার্থক্যরেখা না টেনে বরং আরেকটু মানবিকবোধ সম্পন্ন হউন। যদিও সরকার ইতোমধ্যে তাঁর সাধ্যাতীত চেষ্টা শুরু করছে, বাজারদর স্থিতিশীল ও নিয়ন্ত্রণে রাখতে, ঘরে ঘরে বিনামূল্যে কিংবা স্বল্পমূল্যে খাবার পৌঁছে দিতে, এনজিও ঋণের কিস্তি স্থগিত এবং গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ সহ নানা ধরনের বিল পরিশোধে বকেয়া ফি মওকুফ ইত্যাদির বিষয়ে। তবে,সরকারের কাছে, এই মুহুর্তে আমাদের আরো কিছু বিষয়ে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা আশাকরি। যেমন, বাড়ি ভাড়া, স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে অতি-দরিদ্র ও হত-দরিদ্রের ঘরে ঘরে খাবার ও আর্থিক সহযোগিতা পৌঁছে দেওয়া এবং স্বাভাবিক রোগের চিকিৎসাসহ কোভিড-১৯ আক্রান্তদের নিয়ে যারা কাজ করে তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং স্বেচ্ছাসেবীদের মধ্যে যারা মৃত্যুবরণ করবে তাদের পরিবারের জন্য পৃথক অনুদান ঘোষণা করা। অন্যথায় রাষ্ট্র ও সরকারের উদ্দেশ্যে , কবি ফররুখ আহমদের মতো আমাকে বলতে হবে;

  • ” মৃত-সভ্যতার দাস স্ফীতমেদ শোষক সমাজ।
    মানুষের অভিশাপ নিয়ে যাও আজ।
    তারপর আসিলে সময়
    বিশ্বময়
    তোমার শৃঙ্খলগত মাংসপিন্ডে পদাঘাত হানি
    নিয়ে যাব জাহান্নাম দ্বার-প্রান্তে টানি;
    আজ এই উৎপীড়িত মৃত্যু-দীর্ণ নিখিলের অভিশাপ বও;
    ধ্বংস হও
    তুমি ধ্বংস হও।”

 

রহিম উদ্দিন
কবি ও প্রাবন্ধিক


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেইসবুক পেইজ