শনিবার, ০৬ মার্চ ২০২১, ০৯:৫৯ পূর্বাহ্ন

চাঁদপুরে অনুমোদনহীন পাঁচ শতাধিক কিন্ডারগার্টেন!

হাছিনুর আকরাম, চাঁদপুর

চাঁদপুরে ৫৩১টি নিবন্ধনহীন বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়(কিন্ডারগার্টেন স্কুল) রয়েছে। এগুলোতে পাঠ্যপুস্তকের বাইরে নানা ধরনের পাঠ্যপুস্তক, বই-খাতার অতিরিক্ত বোঝা, উচ্চহারে ছাত্রবেতনসহ নানা নামে মাশুল ও চাঁদা আদায় করা হয়। এবং শিক্ষার পরিবেশের জন্য প্রয়োজনীয় নূ্ন্যতম জায়গার অভাব নিয়ে চলছে মানহীন শিক্ষা কার্যক্রম। কিন্তু তদারকি করার যেন কেউই নেই।

চাঁদপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের এর তথ্য অনুযায়ী সারা জেলায় ৫৩১টি কিন্ডারগার্টেন স্কুল রয়েছে। ১৯৬২ সালের রেজিস্ট্রেশন অব প্রাইভেট স্কুল অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী, ২০১১ সালে বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নিবন্ধন বিধিমালা প্রণীত হয়। যার ফলে বৈধ ভাবে বেসকারি স্কুল পরিচালনা করতে গেলে প্রথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে নিবন্ধন নিতে হয়।

একটি কিন্ডার গার্টেন স্কুলের নিবন্ধন তিনটি ধাপে সম্পন্ন করতে হয়। প্রথম ধাপে প্রথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে প্রাথমিক অনুমতির জন্য আবেদন করতে হবে, প্রাথমিক অনুমোদন পাওয়ার ১ বছরের মধ্যে অস্থায়ী নিবন্ধনের জন্য আবেদন করতে হয়, অস্থায়ী নিবন্ধন পাওয়ার ৩ বছরের মধ্যে চূড়ান্ত পর্বে নিবন্ধনের জন্য আবেদন করতে হবে। পাঁচ বছর পর নিবন্ধন নবায়ন করতে হবে।

প্রাথমিক অনুমতির জন্য স্কুল কর্তৃপক্ষকে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের বিভাগীয় উপপরিচালকের কাছে আবেদন করতে হবে। এই ক্ষেত্রে আবেদন ফি মেট্রোপলিটন সিটি ও বিভাগীয় শহরে অবস্থিত বেসকারী পাথমিক বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে পাঁচ হাজার টাকা, জেলা সদরের ক্ষেত্রে তিন হাজার টাকা এবং উপজেলা সদর ও অন্যান্য এলাকার ক্ষেত্রে দুই হাজার টাকা ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে প্রদান করতে হবে। উপপরিচালক তফসিলে বর্নীত স্কুলটি ৬০ দিনের মধ্যে সরেজমিনে পরিদর্শন করবেন এবং আবেদনের সঙ্গে জমা দেওয়া কাগজপত্র পরীক্ষা করে অধিদপ্তরে তাঁর মতামত পাঠাবেন। এরপর অধিদপ্তর এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পদস্থ কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত মূল্যায়ন কমিটি সেই আবেদন যাচাই-বাছাই করে প্রাথমিক অনুমোদনের সুপারিশ করবে। মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ বিবেচনা করার পর নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ বিদ্যালয়টিকে প্রাথমিক অনুমতি সনদ প্রদান করিবে। এই সনদের মেয়াদ হবে সনদ প্রদানের তারিখ হতে পরবর্তী ১ (এক) বছর।

প্রাথমিক অনুমতি সদনপ্রাপ্ত বিদ্যালয়কে ১ বছরের মধ্যে নিবন্ধন কর্তৃপক্ষের নিকট অস্থায়ী নিবন্ধন পাওয়ার জন্য আবেদন করতে হবে। বেসকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অস্থায়ী নিবন্ধনের জন্য মেট্রোপলিটন ও বিভাগীয় শহরের ক্ষেত্রে ৬,০০০=/ (ছয় হাজার) টাকা, জেলা সদরের ক্ষেত্রে ৪,০০০/= (চার হাজার) টাকা এবং উপজেলা ও অন্যান্ন এলাকার ক্ষেত্রে ৩,০০০=/ (তিন হাজার) টাকা ফি প্রদান করতে হবে।

আবেদন দাখিল করার পর নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ সরেজমিনে পরিদর্শন করে ছাত্র-ছাত্রি ভর্তি, উপস্থিতি, প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনি চক্রের হার, সমাপনি পরীক্ষা এবং বৃত্তি পরিক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে অস্থায়ী নিবন্ধন সনদ পত্র প্রদান করিবে। অস্থায়ী নিবন্ধনের মেয়াদ হবে প্রাথমিক অনুমতির মেয়াদ অতিক্রান্ত হওয়ার তারিখ হতে পরবর্তী বছর।

অস্থায়ী নিবন্ধন প্রাপ্তির পর ৩ (তিন) বছর অন্তিক্রান্ত হওয়ার ৬০ (ষাট) দিন পূর্বে চূড়ান্ত নিবন্ধনের জন্য নিবন্ধন কর্তৃপক্ষের নিকট আবেদন করতে হবে। এই ক্ষেত্রে, স্কুলটি মেট্রোপলিটন এরিয়া বা বিভাগীয় শহরে অবস্থিত হলে ১২,০০০=/ (বার হাজার) টাকা, জেলা সদরে অবস্থিত হলে ৮,০০০=/ (আট হাজার) টাকা এবং উপজেলা বা অন্যান্ন এলাকায় অবস্থিত হলে ৬,০০০=/ (ছয় হাজার) টাকা নিবন্ধন ফি প্রদান করতে হবে। আবেদন দাখিল করার পর নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ সরেজমিনে পরিদর্শন করে ছাত্র-ছাত্রি ভর্তি, উপস্থিতি, প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনি চক্রের হার, সমাপনি পরীক্ষা এবং বৃত্তি পরিক্ষার ফলাফল সহ যাবতীয় বিষয় বিবেচনা করে সন্তুষ্ট হলে ৬০ (ষাট) দিনের মধ্যে নিবন্ধন সনদ প্রদান করবে। কোন কারণে নিবন্ধন সনদ প্রদান না করার সিদ্ধান্ত নিলে, তা কারন সহ সাত কর্মদিবসের মধ্যে লিখিত ভাবে আবেদনকারীকে জানাবে। এই বিধিমালা অনুযায়ী এই নিব্ধনের মেয়াদ ৫ (পাঁচ) বছর বলবৎ থাকবে। পাঁচ বছর পর নিবন্ধন নবায়ন করতে হবে। কিন্তু বাস্তবে চাঁদপুরের একটি প্রতিষ্ঠানও নিবন্ধন পায়নি।

একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুল পরিচালনা করার জন্য এবং নিবন্ধন পাওয়ার জন্য এই বিঁধিমালা অনুযায়ী যে সকল শর্ত সমূহ পূরণ করা দরকার-

১। ম্যানেজিং কমিটি গঠন- বেসরকারী বিদ্যালয় পরিচালনা এবং এর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নয় সদস্যের একটি ব্যবস্থাপনা কমিটি থাকবে।

ব্যাবস্থাপনা কমিটির মেয়াদ হবে ইহার প্রথম সভার তারিখ হতে পরবর্তী ৩ (তিন) বছর।

২। তহবিল- প্রত্যেক বেসকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একটি সংরক্ষিত তহবিল এবং একটি সাধারণ তহবিল থাকতে হবে।

সংরক্ষিত তহবিলের পরিমান হবে-

স্কুলটি মেন্ট্রোপলিটন এরিয়ার অবস্থিত হলে – এক লক্ষ টাকা, জেলা সদরে অবস্থিত হলে- পচাত্তর হাজার টাকা, উপজেলা সদর ও পৌরসভায় অবস্থিত হলে- পঞ্চাশ হাজার টাকা এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে অবস্থিত হলে- পঁচিশ হাজার টাকা।

এই টাকা সঞ্চয় পত্র আকারে কিংবা কোন তফসিলি ব্যাংকে স্থায়ী আমাতন হিসাবে জমা রাখতে হবে। নিবন্ধন কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি ব্যতীত এই অর্থ উত্তোলন করা বা ভাঙানো যাবেনা।

সাধারণ তহবিলে যে সকল অর্থ জমা থাকবে তা হল-

স্কুলের ছাত্র-ছাত্রিদের বেতন ভাতা হতে প্রাপ্ত অর্থ, কোন স্থানীয় কর্তৃপক্ষ, বেসকারি প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি প্রদত্ত অনুদান, সরকার বা অন্যকোন সংস্থা হতে প্রাপ্ত অনুদান, শিক্ষা কার্যক্রম ব্যতীত অন্যকোন কর্মকান্ড হয়ে আয় বা অন্য কোন উৎস হতে আয়।

ছাত্র শিক্ষক অনুপাতঃ বেসকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছাত্র শিক্ষকের অনুপাত হবে ৩০:১।

বেসকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভূমী ও ভবনঃ বেসকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নিজেস্ব মালিকানায় অথবা ভাড়ায়- মেট্রোপলিটন এলাকায় নূন্যতম ৮ শতাংশ, পৌরসভা এলাকায় নূন্যতম ১২ শতাংশ এবং অন্যান্ন এলাকার ক্ষেত্রে নূন্যতম ৩ শতাংশ ভূমী থাকতে হবে। উক্ত ভূমির উপর নূন্যতম ৩ হাজার বর্গফুটের কমপক্ষে ৬ কক্ষ বিশিষ্ট ভবন থাকতে হবে। সরোজমিনে কোন প্রতিষ্ঠানেই উপরোক্ত শর্তাবলী পূরণ করতে দেখা যায়নি। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠান তদারকি করার যেন কেউই নেই।

এ ব্যাপারে চাঁদপুর সদর উপজেলা চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম নাজিম দেওয়ান বলেন, ২৮’জানুয়ারি মাসিক সভায় আমার ১৪ জন ইউপি চেয়ারম্যানকে অনুমোদনবিহীন এসব স্কুলর বিরুদ্ধে জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছি। বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে অনেক যোগ্যতা সম্পন্ন শিক্ষকরা যোগদান করেছেন। পক্ষান্তরে এসব স্কুলে অল্প শিক্ষিত প্রশিক্ষণবিহীন জনবল কাজ করছে।

এদিকে জেলা প্রাথমিক সহশিক্ষা অফিসার মোঃ সাবাহ উদ্দিন বলেন, শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার। তাই আমরা কাউকেই বাধ্য করতে পারি না। কেউ যদি স্বেচ্ছায় তার সন্তানকে এধরণের প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করায় তাহলে আমাদের করার কিছুই থাকে না।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেইসবুক পেইজ

Spoken English কোর্স