বুধবার, ২৫ নভেম্বর ২০২০, ০২:০২ অপরাহ্ন

চৌগাছার হোটেলগুলোতে হচ্ছেটা কী?

শামীম রেজা, চৌগাছা (যশোর) প্রতিনিধি

যশোরের চৌগাছার হোটেলগুলোতে নিয়মের কোন বালাই নেই। হোটেল মালিকরা আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ইচ্ছেমত হোটেল ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। ফলে সংরক্ষিত হচ্ছেনা ভোক্তা অধিকার আইন। অসমভাবে খাবারের চড়া মূল্য, গার্সকার্পকে রুই বলে চালানো, সোনালী মুরগিকে দেশি মুরগি বলে বিক্রি করা, হাইব্রিডকে দেশি মাছ বলে চালানো, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে রান্না, পরিবেশন, হাইজিনিং মেইনটেন্যান্স না করার পাশাপাশি বহুবিধ অনিয়মের মাধ্যমে চালানো হচ্ছে হোটেল ব্যবসা। ফলে জনস্বাস্থ্য হুমকির মূখে। ক্রেতাসাধারণ প্রতিনিয়ত হচ্ছেন প্রতারিত।

এতসব অনিয়ম সত্বেও স্যানেটারি কর্মকর্তা নীরব ভূমিকা পালন করছেন। অভিযোগ রয়েছে প্রতিমাসে তিনি হোটেল থেকে মাসিক মাসোয়ারানিয়ে থাকেন। বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন চৌগাছাবাসি।

জানাগেছে, উপজেলা মাইক্রবাসস্ট্যান্ডে অবস্থিত চৌগাছা হোটেল ও নাসির হোটেল, ভাস্কর্য মোড়ে রাশেদ হোটেল, উপজেলা রোড়ে ধানঁসিড়ি হোটেল, হাসপাতালের সামনে আজমেরি হোটেল, সরকারি হাইস্কুল রোডে আনিছুর হোটেলে খাবারের জমজমাট ব্যবসা চলছে। কিন্তু এই ব্যবসার অন্তরালে চলছে সীমাহীন প্রতারণা ও অনিয়ম।

এসব হোটেলগুলোতে খাবারের মান নিয়ে আছে প্রশ্ন। সেইসাথে গলাকাটা দাম। বর্তমানে উপজেলা সদরে বিভিন্ন কলকারখানা গড়ে ওঠার কারনে শিল্প অঞ্চল হিসেবে খ্যাত হয়ে উঠেছে। ফলে প্রতিদিনই বিভিন্ন জেলা শহর থেকে মানুষের যাতায়াত বেড়ে গেছে। প্রয়োজনে বাইরে থেকে আগত ও এলাকার মানুষ হোটেলে খাবার খেতে বাধ্যহন। কিন্তু হোটেলগুলোর খাবারের মান ও দাম নিয়ে অভিযোগ উঠেছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।

হোটেলগুলোতে এক প্লেট ভাত ও তরল ডাল দিয়ে খেতে গেলে ২৫ টাকা বাধ্যতা মূলক। ডেকোরেশনভুক্ত হোটেল গুলোতে তরকারি ও মাংশের পাশাপাশি সবজির দাম অত্যাধিক। হোটেল মালিকরা যে যেভাবে পারছে, নিজ থেকেই খাবারের দাম নির্ধারণ করে ব্যবসা চালাচ্ছে।

সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হোটেলগুলোতে দুইটি রুটি ডাল দিয়ে খেতে ৩০ টাকা লাগে। অপর দিকে এক প্লেট ভাত ১৫ টাকা, ডিম ভাজি ১৫ টাকা, আলু ভর্তা ৫ টাকা, সোনালী মুরগির রোস্ট ১১০ টাকা, খাসির মাংস ১৩০ টাকা, সাধারণ যে কোন মাছ ৬০ টাকা, এক পিচ সিং মাছ ১৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। অথচ উপরোক্ত তালিকার খাবার সাধারণ হোটেলগুলোতে অনেক কমে পাওয়া যায়। এছাড়া সবজি রান্না করতে বাজারের সব থেকে নিচু মানের আলু পেয়াজ, গাজর ও শশা ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

হোটেলগুলোতে গার্স কার্প মাছ রুই মাছ বলে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন মাছ ব্যবসায়ী জানান, চৌগাছার সব হোটেলেই আমরা গার্স কার্প, চাষের পাবদা ও সিং মাছ সাপ্লাই করে থাকি। কিন্তু হোটেল ব্যবসায়ীরা গ্রাসকার্প মাছকে রুই মাছ, পাবদা ও শিং মাছকে দেশী মাছ বলে চালিয়ে থাকে।

হোটেল ব্যবসায়ীরা মানুষের প্রয়োজনকে ব্যবহার করে ব্যবসার নামে অতিরিক্ত মুনাফা আদায় করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ভোক্তা অধিকার আইন সংরক্ষণ আইন অনুসারে এ ধরনের স্বেচ্ছাচারিতা বন্ধে কোন কার্যকরি পদক্ষেপ দেখা যায় না। যদিও ভোক্তার স্বার্থ দেখার জন্য উপজেলা পর্যায়ে সরকারি কর্মকর্তা থাকলেও তারা এ বিষয়ে মোটেও সক্রিয় নন। এ সব হোটেলগুলোতে কোন তদারকিই হয় না বলে সাধারণ জনগন জানিয়েছেন। ফলে মালিকরা বেপরোয়া ভাবে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে খাবারের দাম আদায় করে যাচ্ছে।

হোটেলে খাবার খেতে আসা একজন জানান, বাজারে একটি ডিমের মূল্য ৭ টাকা কিন্তু হোটেল মালিকরা আমাদের জিম্মি করে একটা সিদ্ধ ডিম বা ভাজি ডিম নিচ্ছে ১৫ টাকা। এখানে একটি ডিম খাবারের প্রক্রিয়াজাতকরণ করে মুনাফা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে ৮ টাকা। এছাড়া বাজারে এক কেজি সোনালী মুরগি বিক্রি হচ্ছে ২২০ টাকা। আর হোটেল মালিকরা মুরগির রোস্টের জন্য ৬’শ থেকে ৭’শ গ্রাম মুরগি ক্রয় করেন বলে হোটেল কর্মচারী সূত্রে জানা গেছে। তার দাম দাড়ায় ১৪০ টাকা। সেখানে ৪ পিচ রোস্ট করে বিক্রি করা হচ্ছে ৩’শ ৬০ টাকা। যা দিনে দুপুরে ডাকাতি করা হচ্ছে। বিষয়টি যেন দেখার কেউ নেই। ওই ব্যক্তি আফসোস করে বলেন, আমাদের দেশকে বলা হয় মাছে ভাতে বাঙালি। কিন্তু সেই কথার বাস্তবতা কত দূর। বর্তমানে “আমরা টাকাই ভাতে বাঙালি”। ব্যবসার মূল উদ্দেশ্য হলো মুনাফা করা। কিন্তু অতিরিক্ত মুনাফা করা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। ফলে হোটেল মালিকরা লাখলাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। আমাদের দেশের প্রচলিত আইনও এ স্বেচ্ছাচারিতা সমর্থন করে না।

তথ্যসূত্রে জানা গেছে, ২০০৯ সালের ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ১৮৬০ সালে দ্য বিধি, ২০০৯ সালের ট্রেডমার্ক আইন রয়েছে। একই ভাবে ১৯৫৭ সালের অত্যাবশকিয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ আইন রয়েছে। এসব আইনে বলা হয়েছে, ভোক্তা অধিকার আইন কেউ ক্ষুন্ন করলে তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ডসহ বিভিন্ন শাস্তি ও জরিমানা রয়েছে।

মাঝেমধ্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বে ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা হলে ভোক্তা সাধারণ খুশি হন। তবে এই অভিযান আরো জোরদার করা জরুরী বলে অনেকে মনে করেন। ভোক্তা সাধারণদের দাবি, ভ্রাম্যমান আদালত খাবারের মান যাচাই বাছায়ের পাশাপাশি খাবারের দাম যাচাই বাছাই করলে খাবারের দাম নিয়ন্ত্রণে আসবে। একই সাথে হোটেলগুলোতে খাবারের মূল্য নির্ধারণের ব্যবস্থা করলে হোটেল মালিকরা ইচ্ছেমত আইনকে অমান্য করতে পারবেনা।

এদিকে এসব দেখভালের জন্য উপজেলা স্যানেটারি ইন্সপেক্টর নিয়োজিত রয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, উপজেলা স্যানেটারি ইন্সপেক্টর নিয়ামত আলী রহস্যজনকভাবে এসব অনিয়মের কোনকিছু দেখভাল করেননা। তিনি হোটেল মালিকদের নিকট থেকে মাসিক মাসোয়ারা নিয়ে থাকেন বলে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। উল্লেখিত হোটেলগুলোতে সীমাহীন অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা, হোটেল কর্মচারীদের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার পরিবেশন, পঁচা-বাসি খাবার বিক্রি, অবিক্রিত রান্নাকরা মাংস, সবজি পরের দিন বিক্রি করা সহ নানাবিধ অনিয়ম চললেও স্যানিটারি ইন্সপেক্টর দেখেও না দেখার ভান করে চলেন।

নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্র জানিয়েছে, হোটেল মালিকদের সাথে স্যানিটারি ইন্সপেক্টর নিয়ামত আলীর রয়েছে গভীর সখ্যতা। তাঁর এই সখ্যতার রহস্য কি? সেটা সহজেই অনুমান করেন স্থানীয় ক্রেতা সাধারণ।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেইসবুক পেইজ