শুক্রবার, ২৭ নভেম্বর ২০২০, ১০:৫৬ অপরাহ্ন

করোনা নিয়ে ছড়িয়েছে যে সব গুজব

মো. মতিউর রহমান, খুবি প্রতিনিধি

একুশ শতকের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ করোনা ভাইরাস ডিজিজ ২০১৯ (কোভিড -১৯)। SARS-CoV-2 ভাইরাসের সংক্রমণ বর্তমানে বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থার জন্ম দিয়েছে। ৩১শে ডিসেম্বর চীনের উহানে ভাইরাসটি সনাক্ত হওয়ার পর বিশ্বের প্রায় সকল দেশ ও অঞ্চলে এটি ছড়িয়ে পড়েছে এটি। গত ১০৩ দিনে মারা গেছে ১০৩ হাজারেরও বেশি মানুষ এবং প্রতিনিয়ত দীর্ঘ হচ্ছে এ মৃত্যুর মিছিল।

ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে নানা ধরণের গুজব। সরাসরি গুজবের কারণেই প্রাণ দিতে হয়েছে অনেকেই। ফলে বর্তমান বিশ্ব একই সাথে যুদ্ধ করছে করোনা ভাইরাস আর গুজব ভাইরাসে বিরুদ্ধে।

ফেসবুক,টুইটার, হোয়াটসঅ্যাপ এবং ইউটিউব এবং ভুঁইফোট নিউজ পোর্টাল এসব গুজব ছড়ানোর প্রধান মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে। বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া দুই ডজন গুজব নিচে তুলে ধরা হলো।

১. করোনামুক্তি থানকুনি পাতায়:
‘তিনটি থানকুনিপাতা খেলেই মুক্তি পাওয়া যাবে করোনাভাইরাস থেকে। তবে ফজরের নামাজের আগেই খেতে হবে এ পাতা।’ বাংলাদেশে করোনা নিয়ে এটাই প্রথম গুজব। একজন পীরের স্বপ্নের উদ্ধৃতি দিয়ে গত ১৬ মার্চ গভীর রাতে বরিশাল থেকে এ গুজবটি ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাত দুইটা থেকে ফজর নামাজের আগ পর্যন্ত পাতা খাওয়ার হিড়িক চলে। কোথাও কোথাও থানকুনিপাতা খেতে মাইকযোগে আহ্বান জানানো হয়। কেউ কেউ তাদের পরিচিত জনকে মুঠোফোনে পাতা খাওয়ার পরামর্শ দেন। তবে কোন পীর এটি স্বপ্ন দেখেছেন তা আজও পর্যন্ত জানতে পারেননি বাংলাদেশের মানুষ।

 

২. হ্যালো রোহান সাবধানে থেকো:
‘হ্যালো রোহান, তুমি নামাজ কালাম পইড়ো। আল্লাহ ছাড়া আসলে কেউ বাঁচাইতে পারবেনা। আমি আজকেও দুইটা করোনা রুগী রিফিউজ করছি। কথা বুঝতে পারছো?’…
৩৫ সেকেন্ডের এ অডিওটি
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক মেসেঞ্জারে বেশ ভাইরাল হয়। যেখানে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে কর্মরত এক চিকিৎসক রোহান নামের জনৈক ব্যক্তিকে আবেগভরা কণ্ঠে নিরাপদ থাকার জন্য সতর্ক করে বলেন, সরকার ১৮-১৯ জনের মৃত্যুর সংবাদ গোপন করেছে। পরে পুলিশ গত ২১ মার্চ এ অডিও গুজবের মূল হোতা ইফতেখার আদনান নামে এক চিকিৎসককে গ্রেফতার করে রিমান্ডে পাঠায়।

৩. গোমূত্রে প্রতিহত হবে করোনা:
করোনা থেকে মুক্তি পেতে ভারতে গোমূত্র পানের খবর ছেপেছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স । ব্যক্তি উদ্যোগের পাশাপাশি গত ১৪ মার্চ রাজধানী নয়দিল্লিতে হিন্দু মহাসভার সভাপতি চক্রপাণি মহারাজের আয়োজনে গোমূত্র পানের পার্টিরও আয়োজন করা হয়েছিলো। সেখানে ২০০ মানুষ অংশ নেয়।
ভারতের বিভিন্ন জায়গায় গোমূত্র বিক্রির দায়ে গ্রেফতারের খবর পাওয়া গেছে। পরবর্তীতে অতিরিক্ত গোমূত্র পানের কারনে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার খবর পাওয়াও যায়।

 

৪. শিশুর মূত্রে করোনা প্রতিষেধক:
শিশুদের প্রস্রাবের সাথে তিলের তেল মিশিয়ে সমস্ত শরীরে লাগালে করোনা থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে- এমন একটি গুজব ছড়িয়ে পড়েছে আফ্রিকাতে। সূত্র: দ্যা আফ্রিকান রিপোর্ট।

৫. চায়না পণ্যে ছড়ায় করোনা:
চীনে করোনার প্রাদুর্ভাব বাড়ার পর কলকাতায় চাইনিজ জিনিস-পত্রের বিক্রি আশঙ্কাজনক হারে কমে যায়। অনেক দোকানদার ৩/৪ মাস আগে কেনা জিনিসপত্রগুলোকেও ধুয়ে শুকানো শুরু করো। আমাদের দেশের চাইনিজ রেস্টুরেন্টগুলো প্রায় ক্রেতাশূন্য হয়ে পড়ে। মানুষ মনে করতে থাকে চাইনিজ পণ্য, রেস্টুরেন্ট, খাবার ইত্যাদির মাধ্যমেও করোনা ছড়াতে পারে। কিন্ত এ ভাইরাস কোনো বস্তুর ওপর কয়েক ঘণ্টা মাত্র থাকতে পারে। অথচ চীন থেকে কোনো পণ্য দেশে আনার সমস্ত প্রক্রিয়া শেষ করতে কয়েকদিন, সপ্তাহ, এমনকি মাসও লেগে যায়। ততক্ষণে করোনা ভাইরাস আর জীবিত থাকেনা।

৬. নবজাতকের মুখে করোনা:
‘করোনাভাইরাস পার্বতীপুরে আক্রমণ করেছে। এই ভাইরাসের কোনও প্রতিষেধক নাই। তবে লং, সাদা এলাচ আর আদা পানিতে সিদ্ধ করে খেলে করোনাভাইরাস হবে না। দিনে যতবার সম্ভব খেতে হবে। সেই সঙ্গে রং চা চিনি ছাড়া খেলেও করোনাভাইরাস প্রতিরোধ করা যাবে।’
করোনা ভাইরাসের এমন প্রতিষেধকের কথা জানিয়ে মারা যান এক সদ্য ভূমিষ্ট শিশু।
গত ২৬শে মার্চ দিনাজপুর থেকে এ গুজবটি ছড়িয়ে পড়লে মুহূর্তেই সেটি ফেসবুকে ভাইরাল হয়। তবে সংবাদটির প্রচারকারীরাও ঘটনাটি ‘শুনেছেন’ কেউই সচক্ষে দেখননি ।

৭. চীনে কোনো মুসলমান করোনায় আক্রান্ত হয়নি, কোনো মুসলমানের করোনা হবেনা:
করোনা হলো কাফের মুশরিকদের ওপর আল্লার গজব। কোনো মুসলমানের এ রোগ হবেনা। এমনকি এর উৎপত্তিস্থল চীনেও কোনো মুসলমান করোনায় আক্রান্ত হয়নি ; ফলে সেখানে মানুষ দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করছে।
বাংলাদেশের অনেক আলেম (?) বিভিন্নভাবে এ ধরনের তথ্য ছড়িয়েছেন। যার কোনো ভিত্তি নেই। জাপান ভিত্তিক সংবাদ মাধ্যম দ্যা ডিপলোম্যাট ডক কম গত ৫ ফেব্রুয়ারি উইঘুরে ৩৪ জনের করোনায় আক্রান্ত হওয়ায় খবর ছাপিয়েছে আর আল জাজিরা ১০ লক্ষ উইঘুর মুসলমানের করোনায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা জানিয়েছে গত ১৪ ফেব্রুয়ারি। তাছাড়া সারা বিশ্বে বর্তমানে করোনায় আক্রান্ত হয়ে হাজার হাজার মুসলিমের মৃত্যুর খবর শোনা যাচ্ছে। এমনকি পবিত্র বায়তুল্লা শরীফে তাওয়াফ বন্ধ রাখা হয়েছে।

৮. অ্যালকোহলে করোনা প্রতিষেধক:
বিষাক্ত মিথানল (এক ধরনের অ্যালকোহল বা মদ) পানে করোনা সংক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়- ইরানে এমন একটি গুজব ছড়িয়ে পড়ার পর মানুষ গণহারে সেটা পান করতে শুরু করে। ফলে সেখানে ৪৮০ জন মানুষের মৃত্যু হয় এবং প্রায় তিন হাজার মানুষ অসুস্থ হয়। (সূত্র: এপি)

৯. গলায় চার দিন থাকে করোনা:
করোনা ভাইরাস ফুসফুসে পৌঁছানোর পূর্বে গলায় চারদিন থাকে। যদি গরম পানি লবনের সাথে মিশিয়ে কুলকুচা বা গড়গড় করে কুলি করা হয় তাহলে এটি ফসফুসে পৌঁছতে পারেনা। ফলে নিয়মিত এ কাজটি যে করবে তার করোনা হবেনা।
ম্যাসেঞ্জারে এমন একটি লেখা ফরওয়ার্ড করার অনুরোধ পাননি এমন লোকের সংখ্যা নেহায়েত কম।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এ কাজটি কিছু সময়ের জন্য আপনার ভালো অনুভূতির কারণ হতে পারে কিন্তু তা করোনা প্রতিরোধ করতে পারেনা।

১০. প্রচুর খাবেন ভিটামিন সি:

‘বেশি পরিমান ভিটামিন সি, মিষ্টি আলু ইত্যাদি খেলে আপনি সহজে করনায় আক্রান্ত হবেননা। এক্ষেত্রে সিভিট বেশ উপকারী’ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এমন খবরেরও বেশ ছড়াছড়ি। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, এ ধারণার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। মানব শরীর নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট পরিমাণ ভিটামিন সি গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু অতিরিক্ত পরিমানে খেলে তার কোনো কার্যকারিতা থাকেনা; নষ্ট হয়ে যায়। ১১. গরমে ধ্বংস হবে করোনা ভাইরাস: ২৫ ডিগ্রির উপরের তাপমাত্রায় থাকলে সেখানে করোনার সংক্রমন হবেনা। এমনকি নিয়মিত সান বাথ কিংবা ঘন ঘন গরমপানি পান করলে এ রোগ হবেনা। সোস্যাল মিডিয়াতে এ খবরটি বেশ সরগরম ছিলো। গরম আবহাওয়ায় করোনা দূর হয়ে যাবে- এমন কথা বলতে ভোলেননি স্বয়ং ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু মধ্যপ্রচ্যের দেশগুলোতে এখন স্বাভাবিক তাপমাত্রাও ৩০ ডিগ্রির উপরে।

১২. নিঃশ্বাস ধরে রাখুন দশ সেকেন্ড: দশ সেকেন্ড বা তদূর্ধ্ব যদি শ্বাস ধরে রাখতে পারেন এবং এ সময় যদি কোনো কাশি অনুভূত না হয় তাহলে আপনি করোনামুক্ত। এমন গুজবের ছড়াছড়িও কম নয়। অথচ করোনার উপসর্গ হলো শুকনা কাশি, জ্বর, দূর্বলতা, গা ব্যাথা, শ্বাস কষ্ট ইত্যাদি

১৩. হ্যান্ড ড্রাইয়ারে হাত শুকান: আপনি যদি করোনা ভাইরাস থেকে রক্ষা পেতে চান তাহলে বার বার হ্যান্ড ড্রাইয়ারের দিয়ে হাত শুকান। এটিও প্রচলিত একটি গুজব। বাস্তবতা হলো বারবার শুকানোর মাধ্যমে হাত জীবানু মুক্ত হয়না বরং কিছু সময় অন্তর কিংবা বাইরে থেকে বাসায় ফিরে সাবান কিংবা হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে অন্তত বিশ সেকেন্ড হাত ধুলে হাত জীবানুমুক্ত থাকতে পারে।

১৪. মশায় করোনা সংক্রমণ: “মশা মাছি থেকে সাবধান হউন। একজন করোনা আক্রান্ত রোগীকে মশায় কামড়ালে সেটি যদি কোনো সুস্থ মানুষকে কামড়ায় তাহলে আপনিও হতে পারে করোনায় আক্রান্ত।” গরমের কারনে মশার প্রাদুর্ভাব বাড়ার সাথে সাথে বাড়ছে মশা নিয়ে এ ধরণের করোনা গুজব। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, এখনও পর্যন্ত যে গবেষণা হয়েছে তাতে মশার মাধ্যমে কভিড-১৯ এর কোনো সংক্রমন দেখা যায়নি।

১৫. রসুন খাবেন, যত পাবেন: ‘সম্প্রতি চীনের এক গবেষক অমুক টিভিকে জানিয়েছেন যে, ঘন ঘন রসুনের কোয়া কিংবা রস সেবন পেটে অবস্থান করা করোনা ভাইরাসকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিতে পারে। চীনের অনেক মানুষ এটা খেয়ে সুস্থ হয়েছে। এমনকি আমার পরিচিত একজন রোগীও দ্রুত সময়ের মধ্যে সুস্থ হয়ে উঠেছেন। সুতরাং সংবাদটি বেশি বেশি শেয়ার করে অন্যদের জানিয়ে দিন।’ ম্যাসেঞ্জারে এ ধরনের খবরাখবর অনেকই পেয়ে থাকেন। তবে বাস্তবতা হলো রসুন পরিমিত মাত্রায় শরীরের জন্য উপকারী কিন্তু তা করোনা ভাইরাস প্রতিষেধক নয়।

১৬. করোনা বৃদ্ধদের রোগ: ‘এক গবেষণায় দেখা গেছে অমুক দেশে করোনায় আক্রান্ত হয়ে যারা মারা গেছে তাদের অধিকাংশই বৃদ্ধ / বৃদ্ধা। এ রোগে তরুণদের আক্রান্ত হওয়ার তেমন কোনো সম্ভাবনা নেই। সুতরাং বাড়ির বয়স্ক ব্যক্তিদের প্রতি বেশি যত্নবান হোন’ করোনা নিয়ে এমন গুজবও শুনেছেন অনেকে। কিন্তু বাস্তবতা হলো সব বয়সের মানুষই করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। চীনে অশীতিপরায়ণদের যেমন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার রেকর্ড রয়েছে অনুরূপ স্পেনে বহু সংখ্যক তরুণের করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। বয়সের মানদণ্ডে নয় বরং যারা ডায়বেটিস, শ্বাসকষ্ট, এ্যাজমায় আক্রান্ত তাদেরই করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি।

১৭. পানি আর করোনা: ‘শুষ্ক গলায় এবং খালি পেটে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি। সুতরাং ১৫/ ২০ মিনিট অন্তর পানি পান করুন। গলা ও পেট ভেজা রাখুন। করোনা থেকে মুক্ত থাকুন।’ এটিও বহুল প্রচলিত একটি গুজব। এর কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। ক্ষেত্র বিশেষ ঘন ঘন অতিরিক্ত পানি পান শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

১৮. রাশিয়ার রাস্তায় সিংহ:
‘যুক্তরাজ্যের একজন ব্যবসায়ী, লর্ড সুগার ২২ মার্চ টুইট করেন, কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত করতে রাশিয়ার সরকার রাস্তায় পাঁচ শতাধিক সিংহ ছেড়ে দিয়েছে।’ মুহূর্তেই এটি হাজার হাজার লাইক আর রিটুইটে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে যে ছবিটি ব্যবহার করা হয় তাতে দেখা যায় একটি সিংহ রাস্তার দিব্যি হেটে বেড়াচ্ছে।
এটিও বহুল প্রসিদ্ধ এবং প্রচারিত একটি গুজব। কিন্তু ছবিটি ছিলো ২০১৬ সালের। দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে একটি শুটিংয়ের জন্য সিংহটিকে রাস্ আনা হয়েছিলো।

১৯. ব্রেকিং নিউজ, ব্রেকিং নিউজ, ব্রেকিং নিউজ
করোনা নিয়ে আর নয় আতঙ্ক, আর নয় চিন্তা। মাত্র এত টাকায় বিনিময়ে হবে করোনার চিকিৎসা। অমুক কবিরাজ, ফকির, বিজ্ঞানী আবিষ্কার করেছে করোনার প্রতিষেধক। এটিও সম্পূর্ণ গুজব।
তবে চীন, যুক্তরাষ্ট, যুক্তরাজ্য, জাপান, বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশ পরীক্ষামূলক বিভিন্ন ঔষধ তৈরী করেছে। আশা করা হচ্ছে অদূর ভবিষ্যতে করোনার প্রতিষেধক তৈরী হবে এবং এর জন্য বিজ্ঞানীরা নিরালস পরিশ্রমও করে যাচ্ছেন।

২০. একটি ঘোষণা
‘আজ রাত এতটা থেকে এতটা পর্যন্ত বাংলাদেশ অমুক বাহিনী অমুক শহরে হেলিকপ্টারে করোনা প্রতিরোধে স্প্রে করবে। সুতরাং কেউ এ সময়ে ঘর থেকে বের হবেননা। এমনকি ঘরের ছাদে কোনো জামা কাপড়ও রাখবেননা’
ম্যাসেঞ্জারে সচারচার এরকম ম্যাসেজ অনেকেই পেয়ে থাকেন; যা স্রেফ গুজব ছাড়া কিছুই নয়।
এটা শুধু বাংলাদেশে নয়; ২২ মার্চ নেদারল্যান্ডেও এরকম একটি গুজব ছড়ায় যে,করোনা প্রতিরোধে সেখানকার বিমান বাহিনী সমগ্র দেশে জীবানুনাশক ঔষদ স্প্রে করবে। সুতরাং সবাই নিরাপদে থাকুন।

২১. অতি স্বচ্ছ হয়ে যাচ্ছে ভেনিসের নদ-নদী:
ইতালিতে যখন করোনা ভাইরাস দিন দিন ভয়ংকর রূপ নিচ্ছিলো তখন কাভেরি নামক এক ব্যক্তি টুইট করেন যে, ‘৯করোনার এ সংকটকালে ভেনিসের নদীগুলোর পানি স্বচ্ছ পরিষ্কার হয়ে গেছে, মাছগুলো পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, হাঁসগুলো ফিরে আসছে। ভেনিসে এটা প্রথম কোনো ঘটনা।’
গুজবটি একদিনেই প্রায় তিন লক্ষবার রিটুইট হয় এবং প্রায় ১০ লক্ষ মানুষ এটাতে লাইক দেয়। যেমনটা আমাদের দেখা গিয়েছিল আমাদের দেশে সূর্যের চার পাশে বৃত্তাকার অবস্থা দেখা পর।

২২. করোনা ছড়ায় ৫জি:
গুজবটির কথা বাংলাদেশে তেমন শোনা না গেলেও যুক্তরাজ্যে বেশ জোরে সোরেই এ প্রচার হচ্ছে। সেখানকার সোশ্যাল মিডিয়ায় গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, ৫জি নেটওয়ার্ক করোনা ভাইরাস ছড়াতে সাহায্য করে।এরপর অনেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখতে থাকে- করোনা সংক্রমণ থেকে বাঁচতে যার যার এলাকার ৫জি টাওয়ার গুঁড়িয়ে দাও। এসব টাওয়ার থেকেই করোনা ভাইরাস ছড়াচ্ছে। এরপর এমন অদ্ভূত ধারণা বিশ্বাস করে বার্মিংহামের ওই ৫জি টাওয়ারে আগুন ধরিয়ে দেয় স্থানীয়রা। এ প্রসঙ্গে রিডিং বিশ্ববিদ্যালয়ের সেলুলার মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. সাইমন ক্লার্ক বলেছেন, এটি সম্পূর্ণ আবর্জনাপূর্ণ, মিথ্যা ও ভ্রান্ত ধারণা।

২৩.জীবানু অস্ত্র করোনা!
ভারইরাসটি ল্যাবরেটরি থেকে ছড়িয়েছে নাকি পশুপাখি থেকে ছড়িয়েছে? মানুষ তৈরী করেছে নাকি প্রাকৃতিকভাবেই তৈরী হয়েছে -তা নিয়ে রয়েছে সবচেয়ে বড় ধরনের বিতর্ক আর গুজব। এ ব্যাপারে নানা খবরাখবর রবাবরের মতই সোস্যাল মিডিয়াতে ঘুরপাক খাচ্ছে। সাধারণ মানুষের পাশাপাশি রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিরাই জন্ম দিচ্ছেন নানা বিতর্কের। এক্ষেত্রে চীন, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য আর ইরান এগিয়ে রয়েছে। চীন, ইরান দোষ দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রকে আর যুক্তরাষ্ট্র স্বভাব সুলভ ভাবেই আঙ্গুল তুলছে চীনের দিকে। তারা বলছে উহানে অবস্থিত চীনের একটি ল্যাবরেটরি রয়েছে যেখানে ভাইরাস নিয়ে গবেষণা করা হয় আর এ ভাইরাস সেই ল্যাব থেকেই ছড়িয়েছে। তবে এখনও পর্যন্ত কারো অভিযোগের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি পাওয়া যায়নি।
এ পরিস্থিতিতে উদ্বিগ্ন একদল বিজ্ঞানী মেডিকেল জার্নাল ল্যানসেটে একটি বিবৃতি দিয়েছেন যেখানে তারা বলেছেন, “জীবজন্তুর শরীর থেকেই এই করোনাভাইরাস ছড়িয়েছে। ষড়যন্ত্র তত্ত্ব শুধুই ভয়,গুজব এবং ঘৃণা ছড়াবে যাতে এই সংকট মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ব্যাহত হবে।” (সূত্র: বিবিসি)

২৪. সব সমাধান আকাশে: ইতালীয় প্রধানমন্ত্রী
ব্রাজিলের রাষ্ট্রপতি জেইর বোলসোনারো নির্বাচনী প্রচারণার সময় দুষ্কৃতিকারী কর্তৃক ছুরিকাহত হন ২০১৮ সালে। ১৭ ডিসেম্বর, ২০১৯ সালে একটি অনুষ্ঠানে সে ঘটনার কথা স্মরণ করে তিনি আবেগে আপ্লুত হয়ে কেঁদে ফেলেন। কিন্তু গত ২২ মার্চ সেই একই ছবিকে ইতালির প্রধানমন্ত্রী জুসেপ্পে কন্তের ছবি বলে চালিয়ে দেয়া হয় আর সাথে সুন্দর একটি কল্পকাহিনী জুড়ে দেয়া হয়। সেখানে লেখা হয় ইতালির প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা সমস্ত নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছি। আমরা শারীরিক ও মানসিকভাবে মারা গেছি। আর কী করতে হবে তাও আমরা জানি না। পৃথিবীর সমস্ত সমাধান শেষ হয়ে গেছে। এখন একমাত্র সমাধান আকাশের কাছে।’
গুজবটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যাপক প্রসার লাভ করে আর বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষ নিজেদের অনুকূলে স্ব স্ব ধর্মের পক্ষে ব্যাপকভাবে প্রচার করে। দূর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, বাংলাদেশের অনেক প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় খবরটি ফলাও করে প্রচার করা হয়। অথচ ইতালির প্রধানমন্ত্রী ২১ মার্চে একটি টুইটে বলেন, ‘আমরা আমাদের সবচেয়ে ব্যয়বহুল অভ্যাগ গুলোকে পরিত্যাগ করেছি, কারণ আমরা ইতালিকে ভালোবাসি। কিন্তু আমরা ভবিষ্যতের জন্য আমাদের সাহস এবং আশাকে হারাইনি।’

গুজব বর্তমান বিশ্বের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এটি যে কোনো সুষ্ঠু পরিবেশকে ঘোলাটে করে দিতে পারে। একটু সচেতনতা আর সতর্কতা পারে এ গুজব প্রতিরোধ করতে। যেকোনো সংবাদ শোনার পরই সংবাদসূত্র বা সোর্স যাচাই করতে হবে শ্রোতাকে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এবং মূলধারার গণমাধ্যম নির্ভরযোগ্য উৎস হতে পারে।

করোনা মানেই মৃত্যু নয়। সঠিক সময়ে সঠিক পদ্ধতিতে সঠিক পদক্ষেপই আমাদেরকে দিতে পারে করোনা মহামারি থেকে মুক্তি।

লেখক: মো. মতিউর রহমান, 
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা ডিসিপ্লিন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেইসবুক পেইজ