বুধবার, ২৫ নভেম্বর ২০২০, ০২:৫৩ অপরাহ্ন

দেওয়ানি আদালতও যদি হয় ভার্চুয়াল, তবে বর্জন করলে কি হবে তার ফলাফল

কাজী শোয়ায়েব হাসান, সুপ্রিমকোর্ট

করোনার ভয়াবহ থাবায় গোটা পৃথিবী আজ স্তব্দ ও শংকিত। করোনার থাবা থেকে বাদ যায়নি আমাদের প্রিয় বাংলাদেশও। লকডাউনে ঘরে বসে অনেকে অলস সময় পার করছে আবার অনেকের কপালে পড়েছে দুঃচিন্তার ভাজ। অফিস-আদালত, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ প্রায় সকল কর্মস্থল গুলি বন্ধ। কিভাবে চলবে তাহাদের সংসার ?

অন্যদিকে সারাক্ষন আমাদের কানে দুটি ইংরেজি শব্দ এসে অনবরত কড়া নাড়ছে। আর তা হল “পজেটিভ” নাকি “ নেগেটিভ”। এত কিছুর মধ্যেও ন্যায় বিচার ও মৌলিক অধিকার রক্ষা করার ক্ষেত্রে আদালত চালু করার বিশেষ প্রয়োজনীয়তা দেখা দেওয়ায় সরকার এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহন ও বাস্তবায়ন করেছে। আর তা হলো ভার্চুয়াল কোর্টের মাধ্যমে বিচার কাজ পরিচালনা করা।

বর্তমানে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টসহ অধিকাংশ জেলায় এই ভার্চুয়াল কোর্টের মাধ্যমে জামিন শুনানীতে অংশগ্রহন করছেন বিজ্ঞ আইনজীবীগণ। তবে অনেকে সীমাবদ্ধতার কথা প্রকাশ করে ভার্চুয়াল কোর্টে অংশগ্রহন করছেন না। যাই হোক এই টানাপোড়েনের মাঝেও জামিনে অনেক হাজতি কিছু দিনের জন্য হলেও মুক্ত হচ্ছেন। আইনত জামিন পাওয়ার অধিকারটিও সুনিশ্চিত হচ্ছে।

এতো গেল ফৌজদারী মামলার বিষয়। দেওয়ানী প্রকৃতির মামলাগুলির বর্তমান কি অবস্থা ? দেওয়ানী আদালত বন্ধ থাকার কারণে কোন প্রকার দেওয়ানী মামলা রুজু শুনানীসহ আপাতত সকল কার্যক্রম বন্ধ আছে। এরকম অচলাবস্থা হয়তো আরও কয়েক দিন বা মাস বয়ে নিয়ে বেড়াতে হবে বিচারপ্রার্থী সাধারণ জনগণকে। তবে এটা নিশ্চিৎ দেওয়ানী আদালতের এই বন্ধের মধ্যে অনেক বিচার প্রার্থীর  ভাগ্যে তার প্রস্তুতকৃত বা অপেক্ষমান মামলাটি দাখিলের নির্দিষ্ট তামাদির মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে যাবে।

স্বাভাবিক অবস্থায় কোন দেওয়ানী মামলার জন্য নির্দিষ্ট তামাদির মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গেলে উক্ত তামাদি মওকুফ করা বা অব্যহতি প্রদান করা ইচ্ছাধীন কোন ক্ষমতা বিজ্ঞ আদালতের উপর অর্পিত হয়নি। এই বিষয়ে তামাদি আইন ১৯০৮ এ ৩ ধারায় বলা হয়েছে “Subject to the provisions contained in section 4 to 25 inclusive, every suit instituted, appeal preferred and application made after the period of limitation prescribed there of by the first schedule shall be dismissed, although limitation has not been setup asdefence” অর্থাৎ এই আইনের ৪-২৫ ধারার বিধান সাপেক্ষে ১ম তফছিলে বর্ণিত নির্ধারিত মেয়াদ উত্তীর্ণ হবার পর কোন মামলা আপিল বা দরখাস্ত দায়ের করা যাবে না।

এমনকি বিবাদীপক্ষ যদি তামাদির প্রশ্ন উত্থাপন নাও করে, তবুও মামলা বা আপিল বা দরখাস্তটি খারিজ হবে। সুতরাং এটা পরিষ্কার মামলার মেয়াদ আইনের বিষয়বস্তু। তামাদি আইনের ৩ ধারায় প্রয়োগের ক্ষেত্রে বিজ্ঞ  আদালতের ন্যায় পরায়নতার খাতিরে বিবেচনা করার কোন সুযোগ নাই। বিজ্ঞ আদালত মামলার পক্ষদ্বয় বা পক্ষগণ তামাদি বিষয়ে আরজি বা জবাবে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ না করিলেও উক্ত তামাদির বিষয়টি নিয়ে একটি ইস্যু গঠন করেন। বিচার শেষে অর্থাৎ রায়ে মামলাটি তামাদিগ্রস্থ, নাকি তামাদি যুক্ত উহার একটি সিদ্ধান্ত প্রদান করেন। সেক্ষেত্রে মামলাটির মূল বিষয় বা বিরোধীয় কারণটি শতভাগ দালিলিক ও মৌখিক স্বাক্ষির স্বাক্ষ্য দ্বারা প্রমান করা সত্বেও তামাদিগ্রস্থ হওয়ার কারণেই মামলাটি খারিজ হওয়ার জন্য যথেষ্ট।

এবার আসি এই করোনাকালীন সময়ে দেওয়ানী আদালত বন্ধ থাকার কারণে যদি কোন বিচার প্রার্থীর প্রস্তুতকৃত বা অপেক্ষমান দেওয়ানী মামলাটি তামাদির মেয়াদ উত্তীর্ণ হয় তাহলে তার প্রতিকার কি ? চলুন একটু দেখে নিই। তামাদি আইনের ১৯০৮ এর ৪ ধারায় বলা হয়েছে, “Where the period of limitation prescribed for any suit, appeal or application expires on a day when the court is closed, the suit, appeal, or application may be instituted preferred or made the day that the court re-opens”. অর্থাৎ যেক্ষেত্রে কোন মামলা বা আপিল বা দরখাস্তর জন্য  নির্দিষ্ট তামাদির মেয়াদ আদালত বন্ধ থাকার দিন উত্তীর্ণ হয়, সেক্ষেত্রে আদালত পুনরায় খুলবার দিন উক্ত মামলা, আপিল বা দরখাস্তর দাখিল করা যাবে।

প্রকৃতপক্ষে এই ধারাটি “Lex non cogit a dispossibillia” এবং “actus curiae neminem gravidity” এই দুটি ‘Maxim’ এর উপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ১ম ‘Maxim’ টির অর্থ ‘The law does not compel a man to do that which he can not possible to perform’ এবং দ্বিতীয়টির অর্থ ‘ An act of the court shall prejudice no man’ উপরের আলোচনা থেকে এটা স্পষ্ট যেদিন দেওয়ানী আদালত খুলবে ঐ দিনই আদালত বন্ধ কালীন সময়ে যে সকল মামলার তামাদি মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে, ঐ মামলাগুলি দাখিল করিলে উহা তামাদি গ্রহণ হবে না।

এখানে একটি বিষয় খেয়াল করা খুবই জরুরী যে, ঐ মামলাগুলি যদি আদালত খোলার দিন দাখিল করা না হয় অথবা দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ বা কয়েকটি দিন পরে দাখিল করা হয় তাহলে চুড়ান্ত শুনানী অন্তে মূল মামলাটি তামাদিগ্রস্থ হিসাবে বিজ্ঞ আদালত সিদ্ধান্ত গ্রহন করিতে পারবেন। সেক্ষেত্রে ঐ ধরণের মামলা আদালত খোলার দিন দাখিল করলে তামাদির হাত থেকে রক্ষা পাবে। উদাহরণস্বরূপ ১৯৫০ সালে জমিদার উচ্ছেদ ও প্রজাসত্ব আইন এবং ১৯৪৯ সালে অকৃষি প্রজাসত্ব আইনের অধীন অগ্রক্রয়ের মামলাগুলি এই বিশেষ অবস্থার মধ্যে  পড়তে পারে।

এটা গেল করণীয় বিষয়। এবার আসা যাক মূল বিষয়ে। ধরা যাক সরকার পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনা করে আরো কয়েক মাস অফিস আদালত বন্ধ রাখার নির্দেশ দিল এবং বিশেষ প্রয়োজনে ক্রিমিনাল কোর্টের ন্যায় ভার্চুয়াল কোর্টের মাধ্যমে দেওয়ানী প্রকৃতির অতি জরুরী মামলা দাখিল ও শুনানী করার জন্য সারা দেশের দেওয়ানী আদালত খোলার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করল এবং প্রজ্ঞাপন জারীসাপেক্ষে একটি উপযুক্ত নির্দেশনা প্রদান করে ইং ৩০/০৬/২০২০ তারিখে দেশের সকল দেওয়ানী আদালতকে ভার্চুয়াল কোর্ট দ্বারা পরিচালনা করার জন্য নির্দেশ দিলেন। তাহলে মোট কথায় যেটা দাড়াবে ঐ ইং ৩০/০৬/২০২০ তারিখটি আদালত খোলার প্রথম দিন হিসাবে গণনা হবে।

সেক্ষেত্রে বন্ধের মধ্যে তামাদির মেয়াদ উত্তীর্ণ মামলাগুলি আইনত ঐ দিনই ভার্চুয়াল কোর্টের মাধ্যমে বিজ্ঞ আদালতে দাখিল করতে হবে। অন্যথায় মামলাগুলি ম্যানুয়াল কোর্ট এর জন্য অপেক্ষা করে কালক্ষেপন করিলে উহা আইনত তামাদিগ্রস্থ হবে। কারণ দেওয়ানী আদালতগুলি ভার্চুয়ালী খোলা থাকবে। আরেকটি বিষয় মনে রাখা দরকার যে, তামাদি আইনের ৫ ধারা দরখাস্তের মূল মামলার তামাদির ক্ষেত্রে প্রয়োজ্য নয়।

সম্প্রতি বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি জেলার বার এসোসিয়েশন ভার্চুয়াল কোর্ট অংশগ্রহনে আপত্তি জানিয়েছেন, কারণ হিসাবে কিছু সীমাবন্ধতা ও লজিষ্টিক সাপোর্ট নাই মর্মে প্রকাশ করেছেন। ঠিক এরকম একটি অবস্থায় যদি দেওয়ানী আদালতে বিজ্ঞ আইনজীবীগণ ভার্চুয়াল কোর্টে সিভিল মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে  অপারগতা প্রকাশ করেন বা ভার্চুয়াল কোর্টে অংশ গ্রহন না করেন তাহলে বন্ধকালীন তামাদি উত্তীর্ণ মামলাগুলি কি হবে?

ঐ মামলাগুলি যদি ম্যানুয়াল কোর্ট চালু হবার পর দাখিল করা হয় তাহলে মামলাগুলি কি আইনত তামাদিগ্রস্থ হবে না ? আইনত আদালত খোলার প্রথম দিনটি প্রজ্ঞাপনে বর্ণিত ইং ৩০/০৬/২০২০ তারিখ (প্রসঙ্গক্রমে) ধরা হবে, নাকি পরবর্তিতে করোনার প্রাদূর্ভাব চলে গেলে ম্যানুয়াল কোর্টের কার্যক্রমের দিন থেকে ধরা হবে ? আইনের এই জটিল প্রশ্নে যদি কোন একজন বিচার প্রার্থীর মামলাটি তামাদি জনিত কারণে খারিজ হয় তাহলে ঐ ব্যক্তির ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার ভার্চুয়াল কোর্ট বর্জনকারী বিজ্ঞ আইনজীবীগণ গলা চিপে হত্যা করেছেন মর্মে অভিযোগ তুললে কোন অন্যায় হবে কি ? এ প্রশ্নগুলি বার বার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। এই প্রশ্নগুলি বিজ্ঞ গণের কাছে সবিনয় ও শ্রদ্ধাভরে রেখে গেলাম। আরেকটি কথা করোনার এই দগদগে ঘা শুকাতে বেশ বেগ পেতে হবে বৈকি। বিশেষজ্ঞ গণের মতে বেশ কয়েক বছর এই শত্রুর সাথেই নাকি হাসি মুখে বসবাস করতে হবে। সেক্ষেত্রে সরকার দেওয়ানী আদালতকেও একটি ভার্চুয়াল কোর্টের আওতায় নিয়ে আসবে এমন ভাবনাটি খুবই স্বাভাবিক এবং যৌতিক। তাই সর্বস্তরের সকল বিজ্ঞ আইনজীবীদের উচিৎ হবে সীমাবদ্ধতাকে ছাপিয়ে সাধারণ মানুষের আইনি অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষে এবং নিজেদের নূন্যতম সুরক্ষার কথা চিন্তা করে সময়োপযোগী এই ভার্চুয়াল কোর্টকে স্বাগত জানানো। যত তাড়াতাড়ি আমরা বিষয়টি হৃদয়াঙ্গম করতে পারবো ততই আমাদের মঙ্গল হবে।

 

লেখক: কাজী শোয়ায়েব হাসান,
বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্ট।


আপনার মতামত লিখুন :

5 responses to “দেওয়ানি আদালতও যদি হয় ভার্চুয়াল, তবে বর্জন করলে কি হবে তার ফলাফল”

  1. Dipti Roy says:

    ভার্চুয়াল কোর্ট চালু করার বিপক্ষে যে সকল বিজ্ঞ আইনজীবীগন অবস্থান করছেন, তারা বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি এবং তার পরবর্তী ইফেক্ট সম্পর্কে সঠিক বিবেচনা না করেই হয়তো ভার্চুয়াল কোর্ট বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে সকল পর্যায়ে এই কোর্ট চালু করবার আগে আইনজীবী এবং বিচারকদের ধাপে ধাপে অল্প কজন করে (যেহেতু বর্তমান পরিস্থিতিতে বেশি লোক একজায়গায় জমায়েত হলে স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে) প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলে বিষয়টি আরো বেশি ওয়াইজ হবে বলে আমার মনে হয়। এটা একটা লং-টার্ম প্রোসেস তাই শুরু করাটা জরুরি।

  2. Dipti Roy says:

    ভার্চুয়াল কোর্ট চালু করার বিপক্ষে যে সকল বিজ্ঞ আইনজীবীগন অবস্থান করছেন, তারা বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি এবং তার পরবর্তী ইফেক্ট সম্পর্কে সঠিক বিবেচনা না করেই হয়তো ভার্চুয়াল কোর্ট বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে সকল পর্যায়ে এই কোর্ট চালু করবার আগে আইনজীবী এবং বিচারকদের ধাপে ধাপে অল্প কজন করে (যেহেতু বর্তমান পরিস্থিতিতে বেশি লোক একজায়গায় জমায়েত হলে স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে) প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলে বিষয়টি আরো বেশি ওয়াইজ হবে বলে আমার মনে হয়। এটা একটা লং-টার্ম প্রোসেস তাই শুরু করাটা জরুরি।

  3. মোঃ কোহিনূর রহমান says:

    ধন্যবাদ ভাই ,
    এ বিষয় টা নিয়ে আমি ভাবছিলাম।বিষয়টি উপস্থাপন করার জন্য ধন্যবাদ।

  4. Snigdha says:

    Good Articl….

  5. Shazib khan says:

    আপনার সুচিন্তিত এবং সময়োপযোগী মতামত সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য একটি সুশীল চিন্তার প্রতিফলন। আপনার মতো প্রজ্ঞাসম্পন্ন আইনজীবীর জন্যই বলা হয়েছে- A lawyer is an equal partner with the judge in the administration of Justice.[30 BLD(AD)01]

    আপনার জন্য শুভকামনা রইল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেইসবুক পেইজ