বৃহস্পতিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০১:৫৬ পূর্বাহ্ন

ধ্বংশের পথে স্বরূপকাঠীর বৃহত্তম কাঠের ব্যবসা
আব্দুল্লাহ হক (বরিশাল ব্যুরো চিফ) / ১৫৩ ভিউ
সর্বশেষ আপডেট : বৃহস্পতিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১

পিরোজপুর জেলার সবচেয়ে বড় সফল বাণিজ্যিক কেন্দ্র ও ঐতিহ্যের কথা বলতে গেলে শুরুতেই বলতে হয় স্বরূপকাঠীর কথা। অনেকে শুধুমাত্র কাঠ ব্যবসায়ের জন্যই স্বরূপকাঠীর মত উপজেলাকে চিনে থাকেন। বলা যায় স্বরূপকাঠীর ঐতিহ্য দেশ পরিচিতি কাঠ বাণিজ্য এলাকা হিসাবে। প্রায় ১ কিঃমিঃ এলাকা জুড়ে স্বরূপকাঠীর এই কাঠ বাজার।

এটিই দক্ষিণাঞ্চল তথা বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কাঠের বাজার। সর্ববৃহৎ কাঠের বাজার হওয়া সত্ত্বেও এখানে রয়েছে নানা প্রতিকূলতা। বর্তমানে (Covid-19) পরিস্থিতী, সরকারের পৃষ্ঠপোষকতার অভাব, ব্যবসায়ীরা সহজ ও স্বল্প লভ্যাংশে ব্যাংকিং সুবিধা না পাওয়া, ব্যবসায়ী নামে দালাল চক্রের উৎপাত, নদীপথে জলদস্যুদের আক্রমণ, প্রাকৃতিক দুর্যোগে বৃক্ষবিনাশসহ নানা কারণে দক্ষিণাঞ্চলের সর্ববৃহৎ কাঠ ব্যবসা ঐতিহ্য ক্রমেই বিলীনের পথে।

আনুমানিক ১৯১৭ সালের প্রথম দিকে পিরোজপুর এলাকার তৎকালীন বাখারগঞ্জ আওতাধীন বর্তমান স্বরূপকাঠী উপজেলায় সুন্দরবনের সুন্দরী গাছকে কেন্দ্র করে কাঠ ব্যবসার যাত্রা শুরু হয়। ১৯১৮ সালের শেষদিকে স্বরূপকাঠীর সন্ধ্যা নদীর তীর ঘেষে কালিবাড়ির শাখা খালে গাছ বেচাকেনার উদ্দেশ্যে ভাসমান কাঠের হাট গড়ে উঠে।
সুন্দরবনের সুন্দরী গাছ, পাহারী সেগুন, পশুর ও শিশু গাছসহ বিভিন্ন ধরণের গাছ বাওয়ালীরা এ চরের হাটে নিয়ে আসতো। সে থেকেই দেশব্যাপি স্বরূপকাঠীর এ চরের হাট থেকে ফার্নিচারসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহারের জন্য হরেক রকমের গাছ সরবরাহ করা হত।

এরশাদ সরকারের আমলে ১৯৮৭ সালের দিকে সুন্দরবনের সুন্দরী মরা পচাঁ গাছের পারমিট বন্ধ করে দেওয়ায় কাঠের ব্যবসায় ধস নামতে শুরু হয়। যা এখনো কাঠ ব্যসায়ীরা গুছিয়ে উঠতে পারেননি। পারমিট বন্ধ হয়ে যাওয়া অনেক কাঠ ব্যবসায়ী তাদের পুঁজি গুছিয়ে নিয়ে অন্য পেশায় চলে গেছেন।

সুন্দরী কাঠ ব্যবসায় সরকারের বাঁধা-নিষেধের পর থেকেই স্বরূপকাঠীতে গড়ে ওঠে মেহগনি, চম্বল, রেইনট্রিসহ নানা দেশীয় কাঠের বৃহত্তর কাঠ বাজার। প্রতিনিয়ত দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ব্যবসায়ীরা এসে দেড় থেকে দুই কোটি টাকার কাঠ ক্রয় করে নেন উপজেলার কাঠ মোকামগুলো থেকে। আর ক্রয়কৃত মালামাল ট্রাক, লঞ্চ, কার্গোসহ পরিবহনযোগে ব্যবসায়ীরা নিয়ে যান স্ব-স্ব ব্যবসাস্থলে।
কিন্তু পরিবহন সংকট, পাইকারী ক্রেতার অভাবে সরবারহকৃত কাঠ নিয়ে প্রায় দিশেহারা হয়ে পড়ছেন স্বরূপকাঠী কাঠ ব্যবসায়ীরা। সময়মত পরিবহন সংকটে গাছ বিক্রি বন্ধ থাকায় ঋণের বোঝা দিন দিন ভারি হয়ে যাচ্ছে ব্যবসায়ীদের।

এ মূহূর্তে দিশেহারা হয়ে পড়ছেন ছোট ছোট নুতন ব্যবসায়ীরা। আমদানি-রপ্তানী না থাকায় কাজের অভাবে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন স্বরূপকাঠী কাঠ চরের প্রায় হাজার খানেক শ্রমিক। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে চরমভাবে ধস নেমে আসবে স্বরূপকাঠীর একমাত্র বৃহত্তম কাঠ ব্যবসায় এমনটাই ধারণা করা হচ্ছে। ফলে স্বরূপকাঠীর অর্থনীতিতে বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।

স্বরূপকাঠীর এই কাঠ ব্যবসার বর্তমান হালচাল জানতে চাইলে কাঠ ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আঃ হাকিম মিয়া বলেন, দেশের বর্তমান করোনা পরিস্থিতীর মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে খুব কষ্ট হচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে ব্যবসা ছেড়ে জীবিকা অন্বেষনে অন্য কোন কাজ-কর্মে চলে যেতে হবে।

স্বরুপকাঠীতে কাঠ নিতে আসা ঢাকার এক কাঠ ব্যবসায়ী জানান,বর্তমানে Covid-19 পরিস্থিতী এবং বিভিন্ন কারনে
এ ব্যবসায় আগের চেয়ে লাভের অংশ কমে গেছে। এর কারণ নদীমাতৃক এলাকায় ট্রলারযোগে যাতায়াত খরচসহ দিনমজুর ও শ্রমজীবী মানুষের আগের চেয়ে বেতন-ভাতা বেড়েছে অনেক বেশি। এছাড়াও সুন্দবনের সুন্দরী গাছ নিলামে বিক্রি বন্ধ থাকায় দেশীয় গাছে তেমন একটা লাভ হচ্ছে না।

দক্ষিণাঞ্চলের পাথরঘাটা থেকে গাছ নিয়ে আসা এক ব্যবসায়ি জানান, “ধার-দেনা করে প্রায় লক্ষাধিক টাকার গাছ নিয়ে মোটা-মুটি দামে বিক্রির আশায় সাথে তিন জন শ্রমিক নিয়ে ১৫ দিন পর্যন্ত ইন্দারহাটের কাঠ চরে অপেক্ষা করছি। কিন্তু কেনা দামও না মিলায় এখানে বসে খাচ্ছি আর ঘুমাচ্ছি।

স্থানীয় এক কাঠ ব্যবসায়ি , বলেন স্বরূপকাঠী উপজেলার বড় অর্থ উপর্জনকারী মাধ্যম হল দেশব্যাপি পরিচিত এখানকার ঐতিহ্যবাহী কাঠ ব্যবসা। অত্র অঞ্চলের প্রায় ৭-৮ হাজার লোক এ ব্যবসার সাথে জড়িত।
তিনি আরো বলেন গাছ মাপা, মাল লোড-আনলোড করাসহ এখানে কাজ করে প্রতিনিয়ত একজন শ্রমিক ৪০০-৬০০ টাকা উপার্জন করেন। বর্তমানে স্বরূপকাঠী কাঠ ব্যবসার সাথে হাজারের অধিক শ্রমিক নিয়োজিত থেকে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
এছাড়াও ১৩শ-১৪শ শ্রমিক এখানকার কাঠ মোকামে শ্রমিকের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন।

এ ব্যবসায় জড়িত হয়ে এ অঞ্চলের নানান লোক আজ সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত। মিঠাবন, ঢাকা, সাভার, উতরাইল, নারায়ণগঞ্জ, সিলেট, কুমিল্লা, রংপুর, রাজধানীসহ দেশের নানা জায়গা থেকে ব্যবসায়িরা এসে এখান থেকে কাঠ ক্রয় করে সরবরাহ করেন দেশের সর্বত্র।
দৈনিক পঞ্চাশ হাজার থেকে ষাট হাজার সিএফটি গাছ বিক্রি হয়। প্রতিনিয়ত পাইকারী এবং খুচরা বিক্রি মিলিয়ে প্রায় ৩ -৪ কোটি টাকার কাঠ বিক্রি হয় কেবলমাত্র স্বরূপকাঠির কাঠ মোকামে।

এদিকে উপজেলার কাঠ ব্যবসার খ্যাতি দেশজুড়ে পরিচিত লাভ করায় এ ব্যবসায় আকৃষ্ট হয়ে কাঠ ব্যবসার সাথে জড়াচ্ছে শিক্ষিত বেকার যুবকেরা। তারা বহু চরাই-উতরাই পেরিয়ে চাকরির আশা ছেড়ে দিয়ে ব্যাংক, এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে এ ব্যবসায় শুরু করে পরিবার নিয়ে অনেকটা স্বাছন্দে জীবন-যাপন করছিল। নানান প্রতিকূলতার কারণে কাঠ বাজারে ক্রেতা না থাকায় মহা শঙ্কায় পড়েছেন তারা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন যুবক ব্যবসায়ী জানান, ঋন নিয়ে ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করছি। দেনার চাপে রাতে বাসায় থাকতে পারছি না। ক্রমান্বয়ে ভারি হয়ে উঠছে আমাদের ঋণের বোঝা।
Abdullah
তবে বিভিন্ন স্থানে চাঁদাবাজি ও বাজারের অব্যবস্থাপনার কারণে এ ব্যবসা এখন হুমকির মুখে। ফলে সরকার হারাতে বসেছে কোটি টাকার রাজস্ব। সরকারি উদ্যোগ আর যথাযথ পরিচালনায় রক্ষা পেতে পারে দেশের এ সর্ববৃহৎ পাইকারি কাঠের আড়ত।

বর্তমানে এ ব্যবসাকে কেন্দ্র করে চলা কয়েক হাজার পরিবার রয়েছে অর্থনৈতিক ঝুঁকির মধ্যে। অথচ অব্যবস্থাপনা, করোনা ঝুঁকি আর চাঁদাবাজির কারণে ধ্বংস হতে বসেছে জেলার ঐতিহ্যবাহী এ ভাসমান কাঠের বাজার।
উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুল হক বলেন, চাঁদাবাজি ঠেকাতে কাজ করবেন তিনি। কাঠ ব্যবসায়ীদের যাত্রাপথে চাঁদাবাজি বন্ধ করে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছার যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও জানান তিনি।

 

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
Shares