বৃহস্পতিবার, ০৪ মার্চ ২০২১, ০৬:২৩ পূর্বাহ্ন

বাংলা বানান সমাচার (পর্ব-০১)

মো. এরফান আলী, নওগাঁ

আপনি হউন না কেন ছাত্র কিংবা শিক্ষক
চাকরিজীবী কিংবা পেশাজীবী
আপনাকে যেহেতু লিখতেই হয়
সেহেতু বানান নিয়ে থাকে কিন্তু সংশয়।
নানান কারণে বাংলা বানানের আজ বারো অবস্থা
এখানে উল্লেখ আছে কেন এই দুর্দশা।।

ছবিগুলোতে চিহ্নিত বানান দেখুন। এসব পড়তে কোন সমস্যা না হলেও সাইনবোর্ডের শদগুলো বর্তমান বানান রীতি মেনে লেখা হয়নি। সাইনবোর্ড প্রতিষ্ঠানের একনজরের পরিচায়ক আর সাইনবোর্ডের বানান ভুল দেখলে সেই প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে শুরুতেই একটি নেতিবাচক চিত্র ধারিত হয় মনের ক্যামেরায়। তাও যদি মাতৃভাষায় লেখা সাইনবোর্ড হয় তাহলে তো ভাষা শহীদের আত্মাও কষ্ট পায়।

সম্প্রতি বাংলা ভাষায় বানানের ক্ষেত্রে ভুলের ছড়াছড়ি মাত্রাতিরিক্ত পর্যায়ে পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিষয়টিকে অনেকে এক ধরনের নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি বলে মনে করছেন। বাংলা একাডেমির বানান অভিধান থাকলেও পরিস্থিতি উন্নতির কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বাংলা বানান নিয়ে এতোটা এলোমেলো অবস্থা এর আগে কখনো ছিলো কি-না সেটি নিয়ে সংশয় আছে।
আমাদের মাতৃভাষা বাংলা। এই ভাষাটি যেকোন ভাষার চেয়ে সুন্দর ও মধুর। বাংলা ভাষায় অনেকগুলো বর্ণ এবং তার সঙ্গে আরও অনেক সহযোগী চিহ্ণ ব্যবহৃত হওয়ায় প্রায় সকল ধরনের উচ্চারণই এ ভাষাতে করা যায় এবং সুন্দর ও যথাযর্থভাবে মনের ভাব প্রকাশ করা যায় যা পৃথিবীর অনেক ভাষাতেই সম্ভব হয় না। বর্ণ ও সহযোগী চিহ্নের আধিক্যের কারণে অনেক সময়ে আবার প্যাঁচও লাগে। এছাড়া আছে যুক্তবর্ণ, শব্দের উৎপত্তিগত বিষয় ইত্যাদি। এগুলোও প্যাঁচ লাগিয়ে দেয়। সব মিলিয়ে প্রচুর বানান ভুল হয়। বানান ভুল হওয়ার কারণ অনুসন্ধান এবং যথাসম্ভব ভুল এড়ানোর লক্ষ্যেই এই ধারাবাহিক নিবন্ধ লেখার ক্ষুদ্র প্রয়াস।

বাংলা একাডেমির বানান সংস্কার ও কিছু অমীমাংসিত বিষয়:
বর্তমানে বাংলা ভাষার বহুল প্রচলিত শুদ্ধ হিসেবে জেনে আসা অনেক শব্দের বানানে পরিবর্তন করে ভিন্নরূপ দেয়া হচ্ছে। তবে বানানে যে পন্থায়/যুক্তিতে পরিবর্তন আনয়ন করেছেন সেখানে কিছু বিষয় অমীমাংসিত রয়ে গেছে ফলে বানান ভুলের প্রবণতা মাত্রাতিরিক্তভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে। আজকের পর্বে সে বিষয় সমূহ নিয়েই আলোচনা করার চেষ্টা করব।

প্রসঙ্গ কথা: একসময় চর্চার মধ্যে ছিলাম। এখন সেভাবে সময় হয়ে উঠে না। তবুও সময় পেলেই তার সদ্ব্যবহার করার চেষ্টা করি। আমি বাংলা ভাষার কোন পণ্ডিত নই; একজন ছাত্র মাত্র। অামার জানার মধ্যে ভুল থাকতে পারে। সংশোধন করে দিলে কৃতজ্ঞ থাকবো।

১.
সংস্কারদের মতে ই-ঈ এর ব্যবধান কমিয়ে সমতা আনয়নের জন্য বানান সংস্কার করা হয়েছে। যেমন, কাহিনীকে কাহিনি, সুধীকে সুধি, পদবীকে পদবি, শহীদকে শহিদ, শ্রেণীকে শ্রেণি লেখা হচ্ছে।

এই পন্থার দুর্বলতা:
বাংলা ভাষায় হ্রস্ব ই-কার (ি) এবং দীর্ঘ ঈ-কার (ী) নামে দুটি ধ্বনি-প্রতীক আছে। এই ধ্বনি-প্রতীক দুটি এসেছে বৈদিক-সংস্কৃতের হ্রস্ব-ই ও দীর্ঘ- ঈ ধ্বনি থেকে। বাংলাসহ ভারতের প্রায় সব নব্য ভারতীয় আর্যভাষা এই ধ্বনি দুটিকে গ্রহণ করেছে। এর দ্বারা অসংখ্য শব্দ তৈরি হয়েছে এবং তাদের মধ্যে অর্থগত পার্থক্যও রয়েছে। বাংলা ভাষায় ঈ-কারকে স্ত্রী প্রত্যয় হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। এই প্রত্যয়টি দিয়ে পুংলিঙ্গ শব্দকে স্ত্রীলিঙ্গ করা হয়। যেমন, জনক-জননী, নদ-নদী, মানব-মানবী, নর্তক-নর্তকী, পতি-পত্নী, গুণবান-গুণবতী, রূপবান-রূপবতী প্রভৃতি। বাংলা ভাষার সন্ধির ক্ষেত্রেও ঈ-কার প্রয়োজন। যেমন, রবি+ইন্দ্র= রবীন্দ্র, কবি+ইন্দ্র=কবীন্দ্র, পরি+ঈক্ষা= পরীক্ষা ইত্যাদি।

আমার এক সহকর্মী পরীক্ষা বানান সর্বদায় পরিক্ষা লিখেন। তাঁর যুক্তি বানান সংস্কারকরা এটিই লিখছেন। আমি এটি মানতে পারি না। কারণ সন্ধিতে হ্রস্ব+হ্রস্ব/হ্রস্ব±দীর্ঘ/দীর্ঘ+হ্রস্ব মিলে দীর্ঘ হয়। তদানুযায়ী ই+ই=ঈ/ই+ঈ=ঈ হবে। আর সেই নিয়মেই (হ্রস্ব+হ্রস্ব) পরীক্ষা হয়েছে।

সংস্কারকদের মতে পরীক্ষা যদি পরিক্ষা হয় তাহলে রবি+ইন্দ্র=রবিন্দ্র হবে। রবীন্দ্রনাথকে মানুষ রবিন্দ্রনাথ লিখবে। প্রতিষ্ঠিত শব্দে ঈ-কারের পরিবর্তে ই-কার লেখার প্রবণতা চালু হওয়ার কারণে ইতোমধ্যে অনেক ছাত্র-ছাত্রী পরীক্ষার খাতায় রবীন্দ্রনাথকে রবিন্দ্রনাথ লেখা শুরু করেছে।

২.
ঈ-কারের পরিবর্তে ই-কার দিয়ে লিখলে অনেক ক্ষেত্রে শব্দের অর্থের পরিবর্তন ঘটে। যেমন, শহীদ শব্দের অর্থ দেশের জন্য বা ভাল কাজের জন্য আত্মদানকারী ব্যক্তি। আর শহিদ শব্দের অর্থ সাক্ষী। আরবী ভাষায় এরূপ অনেক শব্দ আছে যেখানে ঈ-কার স্থানে ই-কার দিলে অর্থের পরিবর্তন ঘটে। বাংলা একাডেমির বানান রীতি অনুযায়ী ঈদ-কে ইদ লিখতে হবে এবং শহীদকে শহিদ লিখতে হবে। সে নিয়ম চালু করা হয়েছিল। কিন্তু জনমতের চাপে সেটা সম্ভব হয়নি।

৩.
সম্প্রতি ‘সুধী’ শব্দটিকেও ই-কার দিয়েও লিখতে দেখা যাচ্ছে। শব্দটি তৎসম বা সংস্কৃত। সু+ধী= সুধী। সুধী শব্দের অর্থ পণ্ডিত বা জ্ঞানী ব্যক্তি। সংস্কৃতে ই-কারান্ত সুধি শব্দ ক্লীবলিঙ্গ। এখন কেউ যদি আমন্ত্রণপত্রে ‘সুধি’-রূপে সম্বোধন করেন অবস্থাটা কী হলো!

৪.
প্রতিষ্ঠিত এবং সুপ্রচলিত শব্দটি যদি ব্যাকরণগতভাবে ভুলও হয় তাহলেও তাকে বাদ দেয়া হয় না। যেমন, সিংহ, পতঞ্জলি, কুলটা, মনীষা, সীমন্ত প্রভৃতি শব্দ ব্যাকরণগতভাবে ভুল। কিন্তু তা সত্ত্বেও সংস্কৃত বৈয়াকরণেরা তা ত্যাগ করেননি- শিষ্টজনেরা তা ব্যবহার করেছেন বলে।

৫.
বানানের ক্ষেত্রে সম্প্রতি আরও একটি যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে তা হল শব্দের অন্ত্য অ-কারকে ও-কার ( ে া) দিয়ে লেখা। যেমন, কোন কে কোনো, চোট কে ছোটো, বড় কে বড়ো, ভাল কে ভালো, মন্দ কে মন্দো, হত কে হতো, যত কে যতো, কত কে কতো, এগার কে এগারো অনুরূপভাবে বারো, তেরো, ষোলো প্রভৃতি। এভাবে লিখলে শব্দে একটি বাড়তি ও-কার যোগ করতে হয়। এক্ষেত্রে সংস্কারপন্থীদের যুক্তি উচ্চারণ অনুযায়ী বানান লেখা।

উচ্চারণ অনুসারে বানান লিখলে অনেক শব্দেই এ নিয়ম প্রযোজ্য হবে। যেমন, এক কে এ্যাক, তের কে ত্যারো, পঁচিশ কে পোঁচিশ, মেলা কে ম্যালা, অতি-ওতি, করি-কোরি, এত-এ্যাতো, কেন-ক্যানো, করত-কোরতো ইত্যাদি। আদৌ কী এতো সংস্কার সম্ভব?

৬.
ইংরেজি ভাষায় A(a) উচ্চারিত হয় চারভাবে- অ, আ, এ এবং অ্যা। যেমন, ball, father, baby, bat. এক্ষেত্রে যদি আমরা একই A বর্ণকে চারভাবে উচ্চারিত হয় তবে বাংলায় কোন কে কেন কোনো-রূপে উচ্চারণ করতে সমস্যা কোথায়? এত দিন তো আমরা সেভাবেই উচ্চারণ করেছি এবং লিখেছি। তবে এখন কেন শব্দটিতে একটি অতিরিক্ত বর্ণ যোগ করে শব্দটিকে ভারী করা হচ্ছে?

৭.
সংস্কারকদের নিয়ম অনুসারে বানান লিখতে হলে শিক্ষার্থীরা প্রমথ চৌধুরী, বঙ্কিম চন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, কাজী নজরুল ইসলাম সহ তৎকালীন কবি সাহিত্যিকদের বই পড়লে ভিন্নরূপ বানান দেখে বিভ্রান্ত হবে। তাদের লেখার কী পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব? যদি উচ্চারণ অনুসারে বানান লিখতে হয় তাহলে অসংখ্য শব্দে নতুন বর্ণ যোগ করতে হবে। তাতে শব্দের গঠন-প্রকৃতি পরিবর্তন হবে, লেখা এবং টাইপের সময়ও বাড়বে।

৮.
সম্প্রতি একাধিক শব্দকে একসঙ্গে একটি শব্দে রূপান্তর করার প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। প্রথম আলোতে এই প্রবণতা বেশি লক্ষ করা যাচ্ছে। যেমন: নজরুলসংগীত (২৮ জুন ২০১৯; একই শব্দ তারা আবার নজরুল সংগীত হিসেবেও লিখছে যা উপরের ছবিতে উল্লেখ আছে), অনুরূপভাবে রবীন্দ্রসংগীত-রবীন্দ্র সংগীত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম (কখনো আবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম লিখছেন যা ছবিতে দেওয়া আছে), বাড়িপালানো, নির্মাণশ্রমিক (১ এপ্রিল২০২০, পৃষ্ঠা নং ৪, ঢাকা সংস্করণ), এমন অসংখ্য শব্দ দেখা যায়। প্রথম আলো বাংলাদেশের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পত্রিকা সেখানে গুণে মানে তাদের সন্নিকটে কেউ আছে বলে মনে হয়না। প্রতিদিন প্রথম আলো না পড়লে আমার মতো অনেকেরই চলেনা। গনতান্ত্রিক রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হলো সংবাদপত্র। তাও যদি হয় প্রথম আলোর মতো নির্ভরযোগ্য পত্রিকা তবে আমার মতো শিক্ষার্থীর মনে পরিবর্তিত বানানগুলো রেখাপাত করবেই।

৯.
ইংরেজি ভাষায় শব্দের বানান যদি বর্ণক্রমিক/উচ্চারণ অনুযায়ী না হয় তবে বাংলায় কেন উচ্চারণ অনুযায়ী বানান লিখতে হবে তা আমার বোধগম্য নয়। আমার মতে বাংলা বানানের বিশৃঙ্খল অবস্থার এসবই অন্যতম কারণ।

(আগামী পর্ব: বাংলা বানানের নতুন নিয়ম)

  • তথ্যসূত্র:
    ১. প্রমিত বাংলা বানান পরিমার্জিত সংস্করণ ২০১২, কিছু কথা – ড. বেগম জাহান আরা;
    ২. বাংলা বানান সংস্কার: সমস্যা ও সম্ভাবনা- পবিত্র সরকার;
    ৩. ড. নিখিল রঞ্জন বিশ্বাসের প্রবন্ধ সমূহ;
    ৪. ছড়ায় ছড়ায় বাংলা বানান- ড. মহবুবুল।

 

লেখক : মোঃ এরফান আলী
পরিচালক, মৌসুমী এনজিও, নওগাঁ।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেইসবুক পেইজ

Spoken English কোর্স