সোমবার, ০২ অগাস্ট ২০২১, ০৮:১৪ পূর্বাহ্ন

ব্যাংকে ঋণ থাকা অবস্থায় ব্যবসায়ীর মৃত্যু: ৯ বছর পর চাপে ভুক্তভোগী পরিবার
মতিন রহমান, মাগুরা প্রতিনিধি: / ১১৮ ভিউ
সর্বশেষ আপডেট : সোমবার, ০২ অগাস্ট ২০২১

মাগুরায় ব্যাংকের লোন পরিশোধ করা মেয়াদ শেষের আগেই মোঃ আব্দুল মোমিন নামে এক ব্যবসায়ী মারা যান। এরপর দীর্ঘ ৯ বছর কেটে যাওয়ার পরে সুদ আসলে ওই টাকার পরিমাণ বেড়ে হয়েছে প্রায় ৩ গুন। এখন লোনের টাকা পরিশোধে চরম বিপাকে পড়েছে অসহায় ভুক্তভোগী পরিবারটি।

জানা গেছে, মাগুরা সদর উপজেলার বলেশ্বরপুর গ্রামের মোঃ আব্দুল মোমিন ২০০৮ সালের নভেম্বর মাসে ৬ লাখ ৬০ হাজার ৬১৫ টাকার একটি ব্যবসায়ী লোন গ্রহণ করেন ব্র্যাক ব্যাংকের মাগুরা শাখা থেকে। এরপর তিনি মাত্র ২ লক্ষ ৪২ হাজার ৭০০ টাকার কিস্তি প্রদানের পর মারা যান। তিনি আব্দুল মোমিন মাগুরা সদর উপজেলার চাউলিয়া ইউনিয়নের বলেশ্বরপুর গ্রামের মৌলভী আব্দুল মান্নানের পুত্র। মাগুরা সদরের শত্রুজিৎপুর বাজারে মেহেদী ট্রেডার্স নামে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি ব্যাংক থেকে লোন গ্রহণ করেন।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, আব্দুল মোমিন ২০০৮ সালের ১৩ নভেম্বর মাসে ব্র্যাক ব্যাংক লিমিটেড এসএমই মাগুরা শাখা থেকে তিনি এই ব্যবসায়ী লোনটি গ্রহণ করেন। যা মাসিক কিস্তিতে পরিশোধ শর্তে ব্যাংক তাকে এই লোন দেয়। উক্ত লোনের টাকা পরিশোধ করার পরে তিনি মারা গেলে পুরো টাকা পরিশোধ করার নিমিত্তে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ মাগুরার আদালতে একটি অর্থঋণের মামলা করে

উক্ত মামলায় মৃত আব্দুল মোমিনের স্ত্রী সেলিনা বেগম সহ মোঃ আবু নঈম মিয়া ও রায়হান উদ্দিন নামের দুজন গ্রান্টারের বিরুদ্ধে মামলা করে। যার মধ্যে মোঃ আবু নঈম মিয়া ৫ বছর আগে অর্থ্যাৎ ওই মামলা করার আগেই মারা গেছেন। আবু নঈম মিয়ার বাড়ি মাগুরা সদরের গোপালগ্রাম ইউনিয়নের সংকোচখালী গ্রামে। তিনি স্থানীয় একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। এছাড়াও টাকার ওয়ারেশ হিসেবে মামলায় আব্দুল মোমিনের ৩টি কন্যা মাহমুদা খাতুন, মারুফা খাতুন ও মুন্নি খাতুনকে জড়ানো করা হয়েছে। যার মধ্যে দুই কন্যার বিয়ে হয়েছে এবং ছোট মেয়েটি মাদ্রাসায় পড়াশোনা করছে।

এখন মামলা ও লোনের টাকার বোঝা মাথায় নিয়ে চরম দুষ্চিন্তা ও বিপাকে পড়েছেন তার স্ত্রী সন্তানরা সহ লোনের টাকা বরাদ্দের কাগজে সই করা গ্রান্টাররা।

মামলার নথিসূত্রে জানা যায়, আব্দুল মোমিনের মৃত্যুর পর ব্যাংকের টাকার কোনো কিস্তি দেয়নি তার পরিবার। এজন্য ওই টাকার পরিমাণ বেড়ে গিয়ে এখন সুদে আসলে ১৭ লক্ষ ১১ হাজার ৬০৭ টাকা হয়েছে মর্মে মামলা করে।

এসব বিষয়ে আব্দুল মোমিনের স্ত্রী সেলিনা বেগম অভিযোগ করেন, তার স্বামী টাকা তুলেছেন এটা তিনি জানতেন না। স্বামী কিস্তি থাকা অবস্থায় হার্ট এট্যাকে যখন মারা যান। তখন ব্র্যাংক ব্যাংকের কর্তকর্তারা তার বাড়িতে এসেছিলেন। কিন্তু তখনও তারা এই টাকার বিষয়ে তাকে কিছুই জানাননি। বরং ব্যাংকের লোকেরা কয়েক বছর চুপ থেকে এখন ৩ গুন টাকা বাড়িয়ে তাদের বাড়িতে আসে টাকা আদায়ের জন্য এবং তাদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করেছে ব্যাংকের লোকেরা।

তিনি আরো জানান, তাদের কোনো জমি জায়গা সহায় সম্পদ বলে কিছুই নেই। তাই স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি তার বাবার বাড়িতে এসে একই ইউনিয়নের ঘোড়ানাছ গ্রামে ভাইয়েদের মৌখিকভাবে দানকৃত ২ শতাংশ জমির উপর একটি ঘর তুলে বসবাস করছেন। তার ৩টি মেয়ে সন্তান নিয়ে খুব কষ্ট করে জীবনযাপন করছেন। স্বামীর মৃত্যুর পর ২টি মেয়েকে বিয়ে দিলেও ছোট মেয়েটি তার কাছে বড় হচ্ছেন। বর্তমানে তিনি সরকারি ভাবে বরাদ্দ পাওয়া ওই ২ শতক জমিতে সরকারি ঘরে বসবাস করছেন বলে জানান। এছাড়া ঠিকম‌তো দুবেলা দুমুঠো খাবার খেতে পারছি না আর লোনের এত টাকা কিভাবে দেবো। ব্যাংকে লোন থাকার অবস্থায় মারা গেলে টাকা মওকুফ করে দেয় শুনেছি। তারা টাকা মওকুফ করেই নি বরং আসল টাকার সুদ দেখিয়ে মামলা করেছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। সেলিনা বেগম উক্ত লোনের সুদ আসলের সমস্ত টাকা মওকুফের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সহ ব্র্যাক ব্যাংক কর্মকর্তাদের প্রতি সুদৃষ্টি কামনা করেন।

এবিষয়ে লোনের টাকার গ্রান্টার মোঃ রায়হান উদ্দিন অভিযোগ করেন, আব্দুল মোমিন মারা যাওয়ার পরও তার লোনের টাকা মওকুফ না করে বরং আমাদের উপর দায় চাপিয়ে দিয়েছে ব্যাংক কর্মকর্তারা। আমরা কেউ ওই টাকার বিষয়ে জানিনা। তবুও তিনি হয়তো বেঁচে থাকলে অবশ্যই টাকা পরিশোধ করতেন। এখন তো তার পরিবার কোনো মতো দুমুঠো খাবার খেয়ে কষ্টে জীবনযাপন করে বেঁচে আছে। এখন তো মরার উপর খাঁড়ার ঘা! সেখানে এতটাকা কিভাবে তারা দেবে। এজন্য রায়হান উদ্দিন এসব টাকা মাফ করে দেওয়ার জন্য ব্র্যাংক ব্যাংক কর্মকর্তাদের নিকট মর্জি কামনা করেন। রায়হান উদ্দিন সম্পর্কে আব্দুল মোমিনের ভগ্নিপতি। তিনি বলেন ব্যবসায় লোকশানে ক্ষতিগ্রস্ত হন আব্দুল মোমিন। আর সেই শোকে তিনি হার্ট এ্যাটাক করেন।

এসব বিষয়ে জানতে উক্ত ব্র্যাংক ব্যাংকের এসএমই কৃষি মাগুরা শাখার রিকোভারি অফিসার (আর-ই) কিশোর বিশ্বাস জানান, টাকা পরিশোধ করেনি তাই মামলা করা হয়েছে। তবে কোনোভাবে টাকা মওকুফের কোনো সুযোগ আছে কিনা এবিষয়ে জানতে চাই তিনি তার উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলতে বলেন। এসব বিষয়ে ব্যাংকের অন্যান্য কর্মকর্তারা মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে টাকা মওকুফের বিষয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হননি।

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
Shares