বৃহস্পতিবার, ১৫ এপ্রিল ২০২১, ০৮:২৩ অপরাহ্ন

বয়স্ক ভাতা ও আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর দেওয়ার নামে জালিয়াতি

হাছিনুর আকরাম চাঁদপুর প্রতিনিধি

চাঁদপুর জেলার শাহরাস্তি উপজেলার সূচীপাড়া উত্তর ইউনিয়নের শোরসাক গ্রামের মজুমদার বাড়ির নিজাম উদ্দিন কিরনের বিরুদ্ধে সরকারের দেয়া বয়স্ক ভাতা ও বিধবা ভাতার কার্ড এবং আশ্রয়ন প্রকল্পের ঘর দেয়ার নাম করে বিভিন্ন জনের কাছে থেকে টাকা আত্মসাত করার অভিযোগ করছে এলাকাবাসী।

শাহরাস্তি উপজেলার সূচীপাড়া উত্তর ইউনিয়নের শোরসাক গ্রামের বাসিন্দা হলেন কিরণ। তার ছোট ভাই শাহীন মজুমদার হলেন শাহরাস্তি উপজেলার সূচীপাড়া উত্তর ইউনিয়ন যুবলীগের নেতা। কিরন স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মোস্তফা কামালের মামাতো ভাই। চেয়ারম্যানের আত্নীয় হওয়ায় গ্রামে প্রভাব বিস্তার করে চলেন তিনি৷ বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক পরিচয় ও মামাতো ভাইয়ের সখ্যতার পরিচয় দিয়ে একাধিক প্রতারণা করার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি নিজেকে স্থানীয় এমপির ভাগ্নে পরিচয় দিয়েও প্রতারণা করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। কিছু অভিযোগ নিম্নে তুলে ধরা হলঃ

শোরশাক গ্রামের আক্তার হোসেন(২৬), পিতাঃ মৃত বশির উদ্দিন পেশায় একজন বেকারী শ্রমিক। দারিদ্রতার সাথে নিত্য লড়াই করা আক্তারের পরিবারের সদস্য সংখ্যা চার জন। জরাজীর্ণ ঘরে গাদাগাদি করে থাকেন তারা। আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরের কথা শুনে আশাবাদী হয়ে উঠেন আক্তার। ঠিক তখনি পরিচিত হন কিরনের সাথে। অভিযোগ উঠে কিরণ ঘর দেওয়া বাবদ আক্তারের কাছে দাবি করেন মোটা অংকের অর্থ।

এরপর এলাকার মিজান নামক একজনের মাধ্যমে ছয় হাজার টাকাও প্রদান করেন গত ছয় মাস পূর্বে। কিরন টাকা নেওয়ার পরেও ঘর দিচ্ছি, দিবে বলে আক্তারকে ঘোরাচ্ছে। বর্তমানে আশাহত আক্তার করোনার মহামারীতে একদিকে কাজ নেই, অপরদিকে সামান্য বৃষ্টিতে ঘর দিয়ে পানি পড়ে, এমন অবস্থায় তার স্ত্রী ও একমাত্র সন্তানকে শ্বশুর বাড়ি পাঠিয়ে দিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন নিজের ভাঙ্গা বাড়িতে। টাকা নেওয়ার ব্যাপারে স্বাক্ষী রিপন মিয়া বলেন, “আক্তার গত ছয় মাস পূর্বে সরকারী ঘর পাওয়ার জন্য পান দোকানদার মিজানের মাধ্যমে কিরণকে নগদ ছয় হাজার টাকা প্রদান করেন, আমি বিষয়টি দেখেছি”। টাকা নেওয়ার এতোদিন পরেও ঘর না পাওয়ায় বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।

হাড়াইর পাড়ার গাইন বাড়ির বাসিন্দা দুলাল (৩০), পিতাঃ ইসমাইল, কৃষি কাজ করে খুব কষ্ট করে সংসার চালায়। সরকারীভাবে ঘরের আশায় তিনিও তিন হাজার টাকা প্রদান করেন অভিযুক্ত কিরনকে। নিদারুন কষ্টে জীবন-যাপন করা দুলাল আট মাস পূর্বে টাকা প্রদান করে আজও ঘর পায় নি। অনেকটা আক্ষেপ করেই দুলাল বলেন, “সরকারী বিনামূল্যের ঘর টাকার বিনিময়ে চাওয়াটা আমার নিজের অন্যায়। তবুও একটু সুখের আশায় টাকার বিনিময়ে ঘরের আশায় আজ আমি প্রতারিত। আমি এর বিচার চাই”, বলে কেঁদে ফেলেন। এদিকে দুলালের পিতা ইসমাইল মিয়া(৭৩) বৃদ্ধ ভাতা পাওয়ার আশায় চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের দ্বারে দ্বারে ঘোরার পরে কিরনের সাথে সাত মাস পূর্বে পরিচিত হোন। কিরন তার নিকট বৃদ্ধ ভাতার কার্ড করে দেওয়ার কথা বলে এক হাজার টাকা দাবি করেন। বৃদ্ধ ইসমাঈল মিয়া তীল তীল করে পাঁচ শত টাকা জমিয়ে কিরনের হাতে তুলে দেন। আজ পর্যন্ত তিনিও পান নি কোন বৃদ্ধ ভাতা। তিনি আক্ষেপের সুরে বলেন, “আর কত বয়স হলে আমি পাবো বৃদ্ধ ভাতা। শরীরে বিভিন্ন রোগের বাস। আর কতটা অসহায় হলে জনপ্রতিনিধিরা আমার দিকে সদয় দৃষ্টি দিবেন”।

এদিকে ইসমাইলের আরেক সন্তান হাফেজ নূরে আলমের(২৩) কাছ হতে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর দেওয়ার নাম করে অভিযুক্ত কিরণ নিয়েছেন তিন হাজার টাকা। হাফেজ নূরে আলম নিজের কষ্টার্জিত টাকায় কিনা সাইকেল বিক্রি করে সাত মাস পূর্বে সুখের আশায় তুলে দেন কিরনের হাতে নগদ অর্থ। অথচ এতো দিন পার হলেও ঘরতো দূরে থাকুক, কোনো আশার বাণীও শুনতে পাননি কিরণের নিকট হতে। এলাকাবাসীর অভিযোগ  অসহায় ও গরীব পরিবারগুলোর বিশ্বাস নিয়ে খেলছে কিরণ। নিজে সরকারী অনুদানের কিংবা কাজের কথা বলে প্রতিনিয়ত ঠকাচ্ছে এলাকার নিরীহ মানুষগুলোকে।

অভিযোগের ব্যাপারে অভিযুক্ত কিরন মজুমদার বলেন, “আমি যা করেছি সর্বসাধারণের জন্যই করেছি। যারা অতীতে লুটেপুটে খেয়েছে তারা আজ আমার কারণে করতে পারছে না বলেই আমার বিরুদ্ধে কুৎসা রটাচ্ছে। এতে আমি বিচলিত নই। আপনাদের কিছু জানতে হলো তা চেয়ারম্যান সাহেবের সাথে যোগাযোগ করে জেনে নিন”।

অন্যদিকে ইউপি চেয়ারম্যান মোঃ মোস্তফা কামাল মজুমদার ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, কিরন মজুমদার ইউনিয়ন পরিষদের কেউ নয়। আমি এই ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের সভাপতি, কিরন আমার দলের কোন পদে নেই, তার ছোট ভাই যুবলীগের পদে আছে। কিরন যদি সরকারী দান অনুদানের কথা বলে এলাকাবাসীদের কারও কাছ থেকে কোনো প্রকার টাকা পয়সা নিয়ে থাকে তাহলে সে তার নিজ দায়িত্বে তা বহন করবে। ভুক্তভোগীরা তাদের বাড়ির পাশেই আমার ইউনিয়নের মেম্বারের বাড়ি থাকার পরও কিরনের সাথে যোগাযোগ করেছে। এমনকি ভুক্তভোগীরা আজ পর্যন্ত আমাকে কিছুই জানাইনি, আমি অন্য মাধ্যমে জেনেছি।

 


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেইসবুক পেইজ

Spoken English কোর্স