বুধবার, ২৫ নভেম্বর ২০২০, ০৮:৪৬ অপরাহ্ন

মানসিক প্রশান্তি নিয়ে বাঁচতে চাই

জেসমিন সুলতানা, আইনজীবী

প্রচন্ড বিষন্নতায় ভরপুর একটা রাত কাটালাম। সন্ধ্যা থেকে একটা ভয় আমাকে আঁকড়ে খাচ্ছিল। আমার খালাতো বোনের বাসা তালতলা কবরস্থানের পাশে, একদিন বেড়াতে গিয়ে ওর বারান্দায় থেকে কবরস্থান দেখে ভয় লাগেনি, কতো মানুষ শুয়ে আছে, আসরের নামাজের পর দেখেছিলাম সাদা পান্জাবী, পায়জামা, টুপি মাথায় এক বৃদ্ধ ছেলের কবরের পাশে বসে দোয়া পড়ছেন। প্রতিদিনই নাকি আসেন, মাগরিবের আগে চলে যান। এ হলো বাবা মায়ের ভালবাসা,আর এখন শুনছি করোনাআক্রান্ত পিতা মাতাকে রেখে সন্তান পালিয়ে যায়।

আমার বিয়ান শামসুন নাহার লিজার বাসা আজিমপুর গোরস্তানের পাশে সরকারী বাসভবন,আটতলা বাসা ওর বাসা থেকে সারি, সারি কবর দেখা যায়। সেখানেও ভীত হইনি বরং যতবার গিয়েছি মৃত ব্যক্তিদের রুহের মাগফেরাত কামনা করে দোয়া পড়েছি।

আমার পারিবারিক গোরস্থান মতলবের মান্দার তলী গ্রামের মীর বাড়িতে যেখানে পূর্বপুরুষেরা, বাবা, ভাই, বোন, দাদা দাদী চাচা চাচী সবাই যেখানে শুয়ে আছেন সেখান টা আমার ঘরের মত মনে হয়। এই তো আমার ভাই দুটো শুয়ে আছে জড়াজড়ি করে। জীবিত অবস্থায় এভাবেই দুভাই জড়াজড়ি না হোক খুব ভালবাসায় দিন কাটিয়েছে। ওখানে ভয় করেই না বরং মন টানে।

বিভিন্ন প্রোগ্রামে বিশেষ কর ১৫ ই আগষ্ট বনানী গোরস্থানে যাই জিয়ারত করি সেখানে ও ভয় লাগেনি। যত বার যেখানে গিয়েছি যা দোয়া দরুদ শিখেছি মৃতের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে দোয়া করেছি। যদিও ধর্মে নারীদের কবরস্হানে যেতে নিষেধ আছে।

গতকাল মাগরিবের নামাজের পর হঠাৎ করে আমার আলমিরার দরজা খুলে যায়। আমি দেখছি সারি সারি সাজানো শাড়ি গুলো, সাজানো গোছানো। তিন মাস প্রায় হাত লাগেনি, সাথে আনুষঙ্গিক প্রত্যাহিক জীবনের সমস্ত জিনিসপত্র সব পরে আছে। ভিতরে প্রচন্ড একটা ধাক্কা খেলাম। আমি মরে গেলে সব কিছু এভাবেই পরে থাকবে। হয়তো বা, হয়তো বা না। তাহলে আমাদের কেন এতো চাহিদা, কেন এতো না পাওয়ার বেদনা, কেন এতো হাহাকার।।

এরপর ফোন করে বোনটার কাছ থেকে জানতে চাইলাম বলতো আসলেই তাল তলায় মৃতের সংখ্যা জানাজা, দাফন প্রতিদিন দিন কেমন হয়? ও বললো আগে একটি নির্দিষ্ট সময়ে আসতো, এখন সারাদিনই, আগে মাটি খুড়ে কবর হতো। এখন ছোট্ট ক্রেনে কবর খোড়া হয়। ও বলে আমি এ বাসায় কোন ভাবেই থাকবো না। ওদের ফ্লাটের ছাদ হয়েছে ওয়াল করে করোনারপর যেভাবেই হোক উঠে যাবো। এ সাদা পিপিই পরা লোকদের দিয়ে জানাজা কবর দেয়া আর পারছিনা আপা। তবে এখন বৃষ্টির কারনে কবরে পানি উঠে বলে কবর হচ্ছে নাকি মীরপুর বুদ্ধি জীবী গোরস্তানের পাশে। খেলাম প্রচন্ড ধাক্কা। কবরস্হানটি খুব বড় নয় তাহলে কি??

এর পর এশা,তারাবীহ পড়বো জামাতে, আমার হাজব্যান্ড দেখি খুব মনযোগ দিয়ে ভিডিও দেখছে, সে নামাজ শেষ করে ঘুমাতে এসে বললো জানো কি দেখছিলাম ভিডিও তে আমেরিকা থেকে একজন জানিয়েছে কিভাবে তার নিকটাত্মীয় নিজে আত্মবিশ্বাস রেখে স্বামী স্ত্রী মিলে করোনাকে জয় করছে।

এ গল্প শোনার পর থেকে আমরা কেবলি মনে হচ্ছে আমার প্রচন্ড মাথা ব্যথা, আমার গলা ব্যথা, আমার জ্বর, বমি হচ্ছে , আমি মরে যাচ্ছি,আরো কতো কি, কাউকে কিছু বলিনি, এ যে আমার মনের ভয়। কথায় আছে না বনের বাঘে খায় না মনের বাঘে খায়।

সারারাত কাটিয়ে তিনটায় উঠি তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলাম, কাউকে কিছু না বলে সেহেরী খেয়ে ফজর আদায় করে স্বাভাবিক কাজকর্মের চেষ্টা করে করোনাকে ভুলতে চাচ্ছি। জানিনা আজকের আক্রান্ত বা মৃতের তালিকা কতো? জানিনা আজকে কতো জনের কবর হবে। জন্মেছি যখন মৃত্যু হবে। আমার সাজানো সব কিছুর দিকে তাকিয়ে শুধুই মনে হয়। একদিন চলে যাবো, সবই থাকবে, থাকবোনা শুধু আমি।।

আল্লাহ আমাদের সবুজ শ্যামল এই বাংলাদেশ থেকে করোনা কে উঠিয়ে নাও। মানসিক যন্ত্রনায় নির্ঘুম, অজানা আশংকার করোনা রাত যেন আর কাটাতে নাহয়। চীন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইটালীয়, ফ্রান্সের মতো মৃত্যুর মিছিল যেন বাংলায় না হয়।

মৃত্যুর মিছিল আসলেই কি ঠেকানো যাবে?
আমরা কি ঘরে থাকছি?
হাত বার বার ধুচ্ছি?
সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখছি?
স্বাভাবিক মৃত্যু চাই।

গোসল, জানাজা দাফন চাই, নিজ বাড়িতে। প্রিয়জনের আদর সোহাগ,কোমল স্পর্শে মরতে চাই। আর নির্ঘুম রাত কাটাতে চাই না, মানসিক প্রশান্তি নিয়ে বাঁচতে চাই। সবাই ভাল থাকুন। সুস্হ থাকুন, নিরাপদ থাকুন।।

 

লেখক: জেসমিন সুলতানা, আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেইসবুক পেইজ