মঙ্গলবার, ২৪ নভেম্বর ২০২০, ১২:০৪ অপরাহ্ন

মোবাইলের কলরেট: উল্টোপথে বাংলাদেশ !

মোঃ এরফান আলী, নওগাঁ

ডিজিটাল বাংলাদেশে কমিউনিকেশন সহজল্ভ্য করতে মোবাইলের কলরেট যৌক্তিক হবে সেটিই স্বাভাবিক কিন্তু আমাদের দেশের চিত্র উল্টো। ২০১৮ সালের মাঝামাঝি তৎকালীন ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী এ্যাডভোকেট তারানা হালিম ঘোষণা দিয়েছিলেন মোবাইলের কলরেট কমানো হবে। তাঁর ঘোষণায় আমরা আশান্বিত হয়েছিলাম যে, সত্যিকার অর্থেই আমরা উন্নয়নের মহাসড়কে অগ্রসরমান। পার্শ্ববর্তী দেশের মত আমরাও স্বল্প মূল্যে ভয়েস ও ডেটা সুবিধা পাব। আমাদের আশায় গুঁড়েবালি হতে অবশ্য খুব বেশি সময়ের প্রয়োজন হয়নি। মাত্র ২/৩ মাস পরেই ১৪ আগস্ট হতে মোবাইলের কলরেট হ্রাসকরণের পরিবর্তে প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি করা হয়েছে।

ডাটা ভিত্তিক সেবা চালুর পর ভয়েস কলের মূল্য কমে যায়। টেলিযোগাযোগ সেবার ক্ষেত্রে এটাই আন্তর্জাতিক চর্চা। বাংলাদেশের থ্রিজি, ফোরজি সেবা চালুর পর ভয়েস কলের ট্যারিফ কমবে বলে ধারণা ছিল সবার। কিন্তু বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) সর্বনিম্ন ট্যারিফ ২৫ পয়সা হতে বৃদ্ধি করে ৪৫ পয়সা নির্ধারণ করেছেন। বর্তমান সরকারের অন্যতম ম্যানডেট ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণ করা।

এ ক্ষেত্রে যথেষ্ঠ অগ্রগতিও পরিলক্ষিত হয়েছে। সরকারি প্রায় সকল সেবাই অনলাইনের মাধ্যমে পাওয়া যাচ্ছে। জন্ম- মৃত্যুর নিবন্ধন, পাসপোর্ট, ভিসা যাচাই, জমির রেজিস্ট্রেশন তথ্য প্রাপ্তি প্রভৃতি সেবা অন-লাইনে প্রাপ্তি নিঃসন্দেহে সরকারের অগ্রগতি হিসেবেই বিবেচিত। পক্ষান্তরে ডিজিটাল বাংলাদেশের অন্যতম একটি খুঁটি হলো যোগাযোগ (communication) কে সহজীকরণ ও সহজলভ্যকরণ। যোগাযোগ সহজলভ্য করার কলরেট হ্রাসের পরিতর্তে বৃদ্ধিকরণের ফলে সাধারণ মানুষের নিকট বাড়তি ব্যয়ের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে যা নিঃসন্দেহে ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের অন্তরায়।

দেশে থ্রিজি, ফোরজি চালু হওয়ার ফলে ভয়েস থেকে ডাটায় রূপান্তরের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়েছে। সচেতন গ্রাহকরা ভয়েস কলের পরিবর্তে অ্যাপস্ ভিত্তিক বিভিন্ন সেবা যেমন: ইমো, হোয়াটস অ্যাপস্, মেসেঞ্জার, ভাইবার প্রভৃতি ব্যবহার করে কথা বলার প্রয়াজন মেটাচ্ছেন। এসব অ্যাপস্ থাকা সত্ত্বেও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী কিন্তু ভয়েস কলের উপরই নির্ভরশীল। বেসরকারি ও স্বকর্মসংস্থান খাতে নিয়োজিত দেশের মোট শ্রম শক্তির 98%। তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন্য ভয়েস কলের মাধ্যমে যোগাযোগ করা অপরিহার্য।

প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং এই শ্রেণীর বিশাল একটি জনগোষ্ঠীর প্রধান নির্ভরশীলতা ভয়েস কলের উপর যারা অর্থনীতির চাকাকে সচল রেখেছেন তাদের উপর বাড়তি ব্যয়ের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া কতটা যৌক্তিক তা বোধগম্য নয়। টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান লার্ন এশিয়ার তথ্য মতে ভয়েস কলের সর্বনিম্ন সীমা বেঁধে দেওয়ার এখতিয়ার নেই নিয়ন্ত্রক সংস্থার। প্রতিযোগিতা নিয়মের মধ্যে হচ্ছে কি-না সেটা তদারকির জন্য তারা কাজ করবে । প্রতিবেশী দেশ ভারতে ও আমরা সেই অনুশীলনই দেখতে পাই। ভারতে কোন কোন অপারেটর বিনামূল্যে ভয়েস কলের সুবিধা দিচ্ছে।

এটা শুরু হয়েছে ২০১৬ সালে জিও কোম্পানির হাত ধরে। ভারতের শীর্ষ ধনী মুকেশ আম্বানীর মালিকানাধীন ‘জিও’ নামক মোবাইল কোম্পানী গ্রাহক আকর্ষণ করতে ফ্রি ভয়েস কল অফার করলে অন্যান্য কোম্পানীও ফ্রি ভয়েস কল দিতে বাধ্য হয় যা অদ্যাবধি কার্যকর রয়েছে। ভারতের টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থাও একে টেলিকম আইন বহির্ভূত ও পরিপন্থী নয় বলে মনে করছেন। গত বছর কয়েকটি অপারেটর ভয়েস কলের সর্বনিম্ন মূল্য নির্ধারণ করে দেওয়ার আবেদন করলে তা নাকচ করে দেন নিয়ন্ত্রক সংস্থা। পক্ষান্তরে বিটিআরসির এমন সিদ্ধান্তের ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের অবস্থান হাস্যকর হয়েছে।
বিটিআরসির মতে- সেল ফোন অপারেটরদের অননেট ও অফনেট এতদিন ভিন্ন হারে ট্যারিফ ছিল। এতে অফনেট গ্রাহকদের খরচ বেশি হত তাই গ্রাহকদের খরচ কমানোর জন্য অননেট অফনেট বাতিল করে একই মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়াও মোবাইল নম্বর অপরিবর্তিত রেখে (মোবাইল নাম্বার পোর্টেবিলিটি-এমএনপি) সেবা চালু করা হয়েছে; যার ফলে কোন একক অপারেটরের আধিপত্য হ্রাস পাবে এবং ছোট অপারেটর সমূহও প্রতিযোগীতায় টিকে থাকতে পারবে। নিঃসন্দেহে এটি একটি ভাল উদ্যোগ কিন্তু এক্ষেত্রে সর্বনিম্ন কলরেট ২৫ পয়সা রেখেও তা বাস্তবায়ন করা যেত। তাছাড়া ৫টি কোম্পানীর স্বার্থ কি ১৪ কোটি মানুষের স্বার্থের চেয়ে বড়?

ডিজিটাল বাংলাদেশের আর একটি অন্যতম অনুষঙ্গ ছিল অবাধ তথ্য প্রবাহ। এক্ষেত্রে অনলাইনে সাধারণ মানুষের অভিগম্যতা বৃদ্ধি করা আবশ্যক। সাধারণ মানুষকে অনলাইনে টানার জন্য ইন্টারনেটের মূল্য কমানো আবশ্যক । পাশ্ববর্তী দেশে ৩০দিন মেয়াদে ৯৯ টাকায় ৫ জিবি ফোরজি ইন্টারনেট পাওয়া যায়। আমাদের দেশে এমন সেবা পেতে গ্রাহককে গুনতে হয় প্রায় ৬০০ টাকা।

এক্ষেত্রে মোবাইল ফোন অপারেটরদের খোঁড়া যুক্তি তারা বেশি টাকায় থ্রিজি লাইসেন্স ক্রয় করেছে তাই কম টাকায়। এ’ধরনের আপত্তি তাদের নতুন নয় সব কিছুতেই যেন তাদের আপত্তির অন্ত নেই।

ভ্যাট কেন দিব, টুজি লাইসেন্স ফি বেশি দিব না, থ্রিজি ফ্রিকোয়েন্সির এত মূল্য কেন, যেখানে মার্কেট নেই সেখানে থ্রিজি চালু করতে বাধ্য করা যাবে না প্রভৃতি। কম দামে লাইসেন্স ক্রয় করলে কম দামে গ্রাহক থ্রিজি/ফোরজি সুবিধা পাবে মোবাইল অপারেটরদের অতীত ইতিহাস কিন্তু তা বলে না। একটু পেছনের ইতিহাস দেখলে দেখা যায়, ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশের মানুষের কাছে যখন মোবাইল ফোন দুষ্প্রাপ্য বিষয় ছিল তখন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্যোগ নিলেন মোবাইল ফোনকে সহজলভ্য করে জনগণের নিকট দ্রুত সহজলভ্য করার। আগ্রহী দুটি নতুন কোম্পানী ও আগের একটি সিডিএমএ কোম্পানীর সাথে তিনি মতবিনিময়ও করেছিলেন। সর্বশেষ থ্রিজি লাইসেন্স নিয়ে যেমন বৈঠক হয়েছে তখন টুজি নিয়ে বৈঠক হয়েছিল বেশ কয়েকটি।

অপারেটর’রা এখনকার মতই তখন প্রধানমন্ত্রীকে বুঝিয়েছিলেন, টুজি লাইসেন্সের ফি কম রাখার জন্য। এতে তারা কম খরচে অবকাঠামো সহ নেটওয়ার্ক স্থাপন করে সুলভে গ্রাহকদের মোবাইল ফোন সেবা দিতে পারবেন। অপারেটরদের স্বপ্নের বেড়াজাল ভরা আশার বাণী শুনে প্রধানমন্ত্রী আশ্বস্ত হয়েছিলেন।

জনগন সুলভে মোবাইল সেবা পাবে, অপারেটরের এই আশ্বাসে তিনি লাইসেন্স ফি কমানোর পরিবর্তে একেবারে মওকুফ করেছিলেন। জনগণের প্রত্যহিক প্রয়োজনে যোগাযোগ ব্যবস্থা যেন অধিকতর সহজীকরণ হয় এই লক্ষ্যে তিনি হাজার হাজার কোটি টাকা মূল্যের ফ্রিকোয়েন্সি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে অপারেটরদের হাতে তুলে দিলেন, যা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। তার পরবর্তী ফলাফল আমাদের সবার জানা। ফ্রি ফ্রিকোয়েন্সি পেয়ে অপারেটরদের সুলভে টেলিকম সেবা হলো ৩০০ টাকার
কার্ডে ২১ দিন মেয়াদ আর কলরেট ৭ টাকা প্রতি মিনিট!

সকল ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা থাকবে সেটাই স্বাভাবিক তাই বলে 14 কোটি গ্রাহকের চেয়ে কয়েকটি কোম্পানির স্বার্থ বড় কেন? অফনেট, অননেট তুলে দেওয়ার নামে গ্রহকের ঘারে বাড়তি খরচের বোঝা চাপানো মোটেই সমীচীন নয়। বাঙালি অত্যন্ত সহনশীল জাতি হলেও বাড়তি কলরেটকে মানুষ সাদরে গ্রহণ করেনি। 14 কোটি গ্রাহকের ভেতরে রক্তক্ষরণ হলেও বিভিন্ন কারণে তার নিস্বরণ হচ্ছে না। কলরেট যৌক্তিক পর্যায়ে অবনমিত করণের জন্য সুশীল সমাজের উল্লেযোগ্য কোনরূপ
ভূমিকাও পরিলক্ষিত হয় নাই।

 

যথাসম্ভব দ্রুততার সাথে কলরেট যৌক্তিক পর্যায়ে হ্রাসকরণ করতে হবে। তা না হলে যে বাড়তি রাজস্বের জন্য ভয়েস ট্যারিফ বৃদ্ধি করা হয়েছে আমজনতা নিজেরাই তার বিকল্প হিসেবে অ্যাপস ভিত্তিক ডেটা ব্যবহার করে প্রয়োজন মেটাবে। স্মর্তব্য যে, ভারত থেকে আমাদের দেশে ভয়েস কল করতে খরচ হয় 2.75 টাকা এ কারণে কিন্তু ভারতে অবস্থানরত বাংলাদেশিরা ভারতের অপারেটরের মাধ্যমে দেশে কথা বলেন। পক্ষান্তরে বাংলাদেশ হতে কথা বললে খরচ হয় 14.67 টাকা তাই বাংলাদেশ হতে কথা বলার ক্ষেত্রে অ্যাপস্ ব্যবহার করে অথবা রিসিভ করে ব্যবহার করে থাকেন। ট্যারিফ নির্ধারণের ক্ষেত্রে এ বিষয়টিকেও গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে।

 

 

লেখক: মোঃ এরফান আলী
পরিচালক, মৌসুমী এনজিও, নওগাঁ।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেইসবুক পেইজ