মঙ্গলবার, ২৪ নভেম্বর ২০২০, ০৭:২৫ পূর্বাহ্ন

রাজবাড়ীতে চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ !

স্টাফ রিপোর্টার

রাজবাড়ী জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ফকীর আব্দুল জব্বারের বিরুদ্ধে ত্রাণ কার্যে অনিয়ম, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বেচ্ছাচারিতা ও প্রতারণার নানাবিধ অভিযোগ পাওয়া গেছে। আর এ অভিযোগ এনেছে খোদ জেলা পরিষদেরই নির্বাচিত ১৬ জন সদস্য।

স্থানীয় সরকার,পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের সিনিয়র সচিব বরাবর লিখিত ওই অভিযোগ পত্রে উল্লেখ করা হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তৃণমূল পর্যায়ে উন্নয়ন কার্যক্রমে জন প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ নিশ্চিতকল্পে প্রথমবারের মত জেলা পরিষদে নির্বাচিত সদস্যদের পদ সৃজন করেছেন। অথচ রাজবাড়ী জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ফকীর আব্দুল জব্বারের স্বেচ্ছাচারিতার কারণে প্রধানমন্ত্রীর এই মহতী উদ্যোগ ভেস্তে যেতে বসেছে।

বিশেষ করে সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে পুরো দেশ যখন করোনা সংক্রমন ও বিস্তার রোধে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করছে, তখন রাজবাড়ী জেলা পরিষদের রহস্যজনক নিষ্ক্রিয়তা এ অঞ্চলের মানুষকে ভাবিয়ে তুলেছে। গত ১৬ এপ্রিল করোনা পরিস্থিতি নিয়ে ঢাকা বিভাগের ৯ জেলার জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সাথে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সে কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রীর ভিডিও কনফারেন্সে রাজবাড়ী থেকে কথা বলার সময় রাজবাড়ী জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ফকীর আব্দুল জব্বার প্রথম স্বীকার করেন করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য সদাশয় সরকার ২০ লক্ষ টাকা অনুদান প্রদান করেছেন। অথচ এর আগে তিনি জেলা পরিষদের সদস্যদের কাছে বারবার বলে আসছেন মন্ত্রণালয় থেকে কোন বরাদ্দ আসেনি। কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মন্ত্রণালয় থেকে করোনা সংক্রান্ত ত্রাণ ও অন্যান্য সরঞ্জাম ক্রয়ের জন্য ২৭ লক্ষ টাকা বরাদ্দ হয়েছে। এই ২৭ লক্ষ বরাদ্দের বিষয়টি জেলা পরিষদের কোন সদস্যই জানেন না। তিনি ৭ লক্ষ টাকা লোকচক্ষুর অগোচরে রেখে আত্নসাতের অসৎ উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রীর সাথে কথা বলার সময় তথ্য গোপন করে প্রতারণামূলক আচরণ করেছে।

অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে জরুরীভাবে অর্থ বরাদ্দ দেওয়ার পরও দীর্ঘ সময় রাজবাড়ী জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ফকীর আব্দুল জব্বার কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি। যাহা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে ভিডিও কনফারেন্সের সময় জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নিজেই উল্লেখ করেন। এরুপ আত্নস্বীকৃত অপরাধীর অবহেলা কোনভাবেই মার্জনাযোগ্য নয়। বিশেষতঃ গত ২ এপ্রিল স্থানীয় সরকার বিভাগের জেলা পরিষদ অধিশাখা থেকে ৪৬.৪২.০০০০.০০০.২২.০০০২-১৫(২)-৫৬১ নং স্মারকে উপসচিব ড. জুলিয়া মঈন স্বাক্ষরিত পত্রে করোনাভাইরাস বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য লিফলেট বিতরণ ও মাইকিং করাসহ করোনা প্রতিরোধে মাস্ক ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার/হ্যান্ড ওয়াশ বিতরণের উদ্যোগ গ্রহণের নির্দেশনা প্রদান করা হয়। কিন্তু এ বিষয়ে অদ্যাবধি কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি।

অভিযোগ রয়েছে, করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় দীর্ঘ নিষ্ক্রিয়তার পর সম্প্রতি রাজবাড়ী জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নিয়ম-নীতির কোন তোয়াক্কা না করে ব্যক্তিগতভাবে নামমাত্র কিছু ত্রাণ সামগ্রী ক্রয় করেছেন। অথচ স্থানীয় সরকার বিভাগের গত ২৯/৪/২০ ইং তারিখের ৪৬.০৯৯.০১৬.০১.০১.০০৫.২০১৯ (অংশ-১)-৯১ নং স্মারকে প্রেরিত পত্রে বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে পিপিআর-২০০৮ (সর্বশেষ সংশোধনীসহ) অনুসরণপূর্বক যাবতীয় আর্থিক বিধি-বিধান প্রতিপালনের নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। তিনি এসব কোন কিছুর তোয়াক্কা না করে বা কোন ক্রয় কমিটি গঠন/দরপত্র/কোটেশন না করে ইচ্ছামাফিক ত্রাণের নামে অর্থ আত্নসাত করে চলেছেন।

এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ৩/৪/২০২০ ইং তারিখের ০৪.০০.০০০০.৫১৪.১৬.০০২.২০.৭৬ নং স্মারকে প্রেরিত পত্রে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ কার্যক্রমে দ্বৈততা পরিহারের লক্ষে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের সাথে সমন্বয় ও তাদের প্রস্তুতকৃত দুঃস্থ ও অসহায় উপকারভোগীর তালিকা অনুসরণ করতে হবে। কিন্তু রাজবাড়ী জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান তার নিজ মালিকানাধীন (নিজেই প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক) এনজিও “কেকেএস” এর স্বার্থ রক্ষার জন্য তাদের মাঠকর্মীদের মাধ্যমে প্রস্ততকৃত তালিকা মোতাবেক যৎসামান্য ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করছেন।

অভিযোগ রয়েছে রাজবাড়ী জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ফকীর আব্দুল জব্বার একাধারে রাজবাড়ী জেলা রেডক্রিসেন্ট ইউনিটের চেয়ারম্যান এবং এনজিও কেকেএস’র নির্বাহী পরিচালক। তিনি রেডক্রিসেন্ট থেকে যাকে ত্রাণ দিয়েছেন তার কাছ থেকে একাধিক জাতীয় পরিচয়পত্র ও পৃথক তিনটি মাষ্টাররোলে স্বাক্ষর করিয়ে নিয়েছেন। কারণ রেডক্রিসেন্টের ত্রাণ দিয়ে জেলা পরিষদের হিসাব দেখিয়েছেন।

রাজবাড়ীজেলা পরিষদের ১৬ সদস্যের স্বাক্ষরিত ওই অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, সদস্যদের কাছে জবাবদিহিতা এড়িয়ে যাওয়ার অসৎ উদ্দেশ্যে চেয়ারম্যান ফকীর আব্দুল জব্বার দীর্ঘদিন পরিষদের সভা আহবান করেন না। এ কারণে পরিষদ সদস্যগণ তাদের মতামত ব্যক্ত করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। তার এধরনের স্বেচ্ছাচারিতার কারণে রাজবাড়ী জেলা পরিষদ তার অতীত ঐতিহ্য হারাতে বসেছে।

উল্লেখিত অভিযোগের ভিত্তিতে রাজবাড়ী জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ফকীর আব্দুল জব্বারের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবী জানান হয়েছে তাদের আবেদনপত্রে। অভিযোগপত্রে স্বাক্ষর করেছেন রাজবাড়ী জেলা পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান ও বালিয়াকান্দি উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোঃ আব্দুল হান্নান, ১ নং ওয়ার্ড সদস্য ও গোয়ালন্দ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোঃ নুরুজ্জামান মিয়া, ৩ নং ওয়ার্ড সদস্য মোঃ আলাউদ্দিন, ৪ নং ওয়ার্ড সদস্য মোঃ নাজমুল হাসান মিন্টু, ৫ নং ওয়ার্ড সদস্য রাশেদুল হক অমি, ৬ নং ওয়ার্ড সদস্য ও রাজবাড়ী জেলা আওয়ামী লীগের সহ-দফতর সম্পাদক নূর মোহাম্মদ ভুঁইয়া, ৭ নং ওয়ার্ড সদস্য মীর্জা মোঃ ফরিদুজ্জামান, ৮ নং ওয়ার্ড সদস্য অধ্যাপক আব্দুস সাত্তার খান, ১০ নং ওয়ার্ড সদস্য মোঃ মিজানুর রহমান, ১১ নং ওয়ার্ড সদস্য ও কালুখালী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক খাইরুল ইসলাম খায়ের, ১২ নং ওয়ার্ড সদস্য ও পাংশা উপজেলা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ উত্তম কুমার কুন্ডু, ১৩ নং ওয়ার্ড সদস্য আহম্মদ হোসেন, ১৪ নং ওয়ার্ড সদস্য মোঃ শাজাহান আলী, ১৫ নং ওয়ার্ড সদস্য মোঃ হাবিবুর রহমান, সংরক্ষিত মহিলা আসনের ৪ নং ওয়ার্ড সদস্য বেগম নুরুন্নাহার, সংরক্ষিত মহিলা আসনের ৫ নং ওয়ার্ড সদস্য ডলি রানী দেবদাস।

অভিযোগের বিষয়ে রাজবাড়ী জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ফকীর আব্দুল জব্বার বলেন, করোনা পরিস্থিতিতে যেসব ত্রাণ সামগ্রী ক্রয় করা হয়েছে পাংশা,বালিয়াকান্দি ও কালুখালী এলাকার ১০ জন সদস্য এসব গ্রহণ করেনি। তবে অন্য ১০ জন সদস্য ত্রাণ সামগ্রী গ্রহণ করেছে।

তিনি পাল্টা অভিযোগ করে বলেন, যেসকল সদস্য ত্রাণ সামগ্রী নিয়েছেন তাদের অনেককে ভয়-ভীতি দেখিয়ে অভিযোগপত্রে স্বাক্ষর করানো হয়েছে।

ত্রাণ সামগ্রী কেনার জন্য সভা আহবান করা হয়নি এ অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করে তিনি বলেন, জরুরী ভিত্তিতে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করতে হবে বিধায় সভা করা হয়নি। এটি পরেও করা যাবে।

এদিকে অভিযোগের বিষয়ে রাজবাড়ী জেলা প্রশাসক দিলসাদ বেগম বলেন, সচিব মহোদয় বরাবর লিখিত একটি অভিযোগের অনুলিপি তার হাতে এসেছে। উর্ধতন কর্তৃপক্ষের কোন নির্দেশনা ছাড়া এবিষয়ে তার কোন করণীয় নেই বলে তিনি জানান।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেইসবুক পেইজ